সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে একটি বিস্তৃত ও কঠোর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন ইরানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়াদ জারিফ। আল জাজিরায় প্রকাশিত একটি বিশেষ নিবন্ধে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, এই যুদ্ধ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি চরম শিক্ষণীয় অধ্যায়। জারিফের মতে, বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করে কেনা নিরাপত্তার যে মডেল এত দিন ধরে এই অঞ্চলে চলে আসছিল, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তিনি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বলয় থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের মধ্যে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। জারিফের এই বিশ্লেষণ এমন এক সময়ে সামনে এল যখন ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়ে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির দিকে এগোচ্ছে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে, ইরানের হামলার কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তেহরানের প্রতি আস্থার মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। এই বিবৃতির কড়া জবাব দিয়ে জারিফ তার নিবন্ধে দাবি করেন, আস্থার এই সংকট একতরফা নয়। তিনি অভিযোগ করেন যে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব সম্পূর্ণ ভুল হিসাব-নিকাশের ওপর ভিত্তি করে ইরানের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল যে ইরান দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং দুটি পারমাণবিক শক্তির সম্মিলিত আক্রমণের মুখে টিকতে পারবে না। কিন্তু ইরান তার সামরিক সক্ষমতা এবং দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে। জারিফ মনে করেন, অর্থনৈতিক চাপ, গুপ্তহত্যা বা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলার যে স্বপ্ন পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা দেখেছিলেন, তা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
আরব প্রতিবেশীদের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে জারিফ উল্লেখ করেন যে, জিসিসি ভুক্ত দেশগুলো এই আগ্রাসনে পরোক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল। আল জাজিরায় প্রকাশিত ওই নিবন্ধে তিনি অতীত ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, গত পাঁচ দশক ধরে এই প্রতিবেশীরা বারবার ইতিহাসের ভুল দিকে অবস্থান নিয়েছে। একসময় তারা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন করেছিল, আর এখন তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করছে। জারিফের দাবি অনুযায়ী, কয়েকটি আরব দেশ তাদের আকাশসীমা, সামরিক ঘাঁটি এবং ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলার সুযোগ করে দিয়েছে। এমনকি তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নৌবাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর উৎসাহও জুগিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এই দেশগুলো আশা করেছিল যে ইরান এই আক্রমণের পর আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না, কিন্তু তেহরানের নিয়ন্ত্রিত অথচ জোরালো পাল্টা জবাব তাদের সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের যে প্রচলিত মডেল রয়েছে, তার তীব্র সমালোচনা করেছেন জাওয়াদ জারিফ। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, বছরের পর বছর ধরে কয়েকটি আরব রাষ্ট্র একটি সহজ সমীকরণে বিশ্বাস করে আসছে—প্রচুর অর্থ ব্যয় করে সর্বাধুনিক মার্কিন অস্ত্র কেনা এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে নিজেদের ভূখণ্ডে জায়গা দেওয়া। তারা ভেবেছিল, এই কেনা নিরাপত্তার ছাতার নিচে তারা অর্থনৈতিকভাবে ফুলেফেঁপে উঠবে। কিন্তু জারিফের মতে, এই মডেল এই অঞ্চলে কোনো প্রকৃত নিরাপত্তা বা দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। উল্টো, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এই দেশগুলো মুসলিম বিশ্বে তাদের সুনাম হারিয়েছে। ওয়াশিংটন যখন এই যুদ্ধের ব্যয়ভার তাদের আরব মিত্রদের ওপর চাপানোর কথা বিবেচনা করছে, তখন এই চুক্তির অন্তর্নিহিত স্বার্থপরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নিবন্ধে জাওয়াদ জারিফ মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ইরানের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মনে করেন, এই ঘাঁটিগুলো কেবল আরব দেশগুলোকে রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়নি, বরং ইরানের ক্ষতি করার জন্যই স্থাপন করা হয়েছে। যে দেশগুলো এই ঘাঁটিগুলোকে তাদের ভূখণ্ডে জায়গা দিচ্ছে, তারা প্রকারান্তরে গোটা অঞ্চলকে সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ, যা তাদের নিজেদের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই ধরনের সামরিক উপস্থিতি আত্মঘাতী বলে তিনি মনে করেন। জারিফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা ভাবছেন যে এই ঘাঁটিগুলো তাদের জন্য নিরপেক্ষ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, তারা আসলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন।
ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগেরও কড়া সমালোচনা করেছেন এই বর্ষীয়ান ইরানি কূটনীতিক। তিনি বলেন, ইসরায়েল কেবল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে না, তারা লবিস্ট এবং চাপ প্রয়োগকারী গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে। উদাহরণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এআইপিএসি (AIPAC)-এর গভীর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন, যা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোকে তেল আবিবের স্বার্থে পরিচালিত করে। জারিফ আরব দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেন যে, ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মানে হলো নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দেওয়া। যে দেশ নিজেদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রকেই ব্যবহার করতে পিছপা হয় না, তারা আরব মিত্রদের কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা নিয়ে তিনি গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।
পরিশেষে, জাওয়াদ জারিফ একটি গঠনমূলক প্রস্তাবের দিকে জোর দিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ইরান বরাবরই `হরমোজ পিস এনডেভার` (HOPE) এবং `মুসলিম ওয়েস্ট এশিয়ান ডায়ালগ অ্যাসোসিয়েশন` (MWADA)-এর মতো আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোর প্রস্তাব দিয়ে এসেছে। এই উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা। জারিফ বলেন, ইরান এবং তার আরব প্রতিবেশীরা এখানেই থাকবে, কিন্তু বিদেশিরা তাদের স্বার্থ ফুরিয়ে গেলেই চলে যাবে। তাই বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার বদলে, ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস এবং ধর্মের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ পশ্চিম এশিয়া গড়ে তোলার এখনই প্রকৃত সময়।
