দীর্ঘদিন ধরে চলা ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে একটি নতুন মোড় লক্ষ করা যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ খুব শীঘ্রই শেষ হতে যাচ্ছে। তেহরান ইতিমধ্যেই একটি মার্কিন শান্তি প্রস্তাব গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখার কথা নিশ্চিত করেছে। বুধবার রাতে জর্জিয়ার এক নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প তার আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অধিকাংশ মানুষই তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বন্ধ করার লক্ষ্যটি বুঝতে পেরেছেন এবং একটি সমঝোতা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস ইরানের সাথে একটি ১৪-দফার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এই সমঝোতা স্মারকটি মূলত একটি রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে, যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনা শুরু হতে পারে। এই ড্রাফটে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করা, দেশটির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই শর্তগুলো একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ওপর নির্ভর করবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রয়টার্স এবং ইরানি সংবাদ সংস্থা ইসনাকে (ISNA) জানিয়েছেন যে, মার্কিন প্রস্তাবটি বর্তমানে তেহরানের বিবেচনাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার পর ইরান পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তাদের চূড়ান্ত মতামত জানিয়ে দেবে। উল্লেখ্য যে, এই মধ্যস্থতায় পাকিস্তান একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, তার দেশ বর্তমানে এই যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তিতে রূপান্তর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রস্তাব নিয়ে বেশ আশাবাদী, তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলে কিছুটা ভিন্ন সুরও শোনা যাচ্ছে। ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি এই ১৪-দফার ড্রাফটকে স্রেফ একটি `উইশ লিস্ট` বা আকাঙ্ক্ষার তালিকা বলে অভিহিত করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, আমেরিকা সম্মুখ যুদ্ধে যা পায়নি, তা আলোচনায় পাওয়ার আশা করা বৃথা। তিনি আরও যোগ করেন, ইরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় ছাড় না দেয়, তবে তারা কঠোর ও অনুশোচনাযোগ্য জবাব দেবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য এসব কঠোর মন্তব্যকে ছাপিয়ে আলোচনার টেবিলে সমাধানের পথ খুঁজছেন। তিনি বুধবার বিকেলে সাংবাদিকদের বলেন যে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের সাথে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ আমেরিকানদের যে সাময়িক ভোগান্তি হচ্ছে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তারও দ্রুত সমাধান হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। ট্রাম্পের মতে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখার নীতিতে তিনি অনড় রয়েছেন এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তির স্বার্থে এই পদক্ষেপ অপরিহার্য।
বর্তমানে পরিস্থিতি যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে সব পক্ষই পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের পরবর্তী বার্তার জন্য অপেক্ষা করছে। যদি ১৪-দফার এই মেমোরেন্ডামটি তেহরান গ্রহণ করে, তবে তা হবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। তবে সামরিক উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। তেহরানের পক্ষ থেকে যেমন `ট্রিগারে আঙুল` রাখার হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে, তেমনি ওয়াশিংটনও তাদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় অনড় রয়েছে। এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে বিশ্ববাসী এখন দেখার অপেক্ষায় যে শেষ পর্যন্ত শান্তি প্রস্তাবটি আলোর মুখ দেখে কি না।
