শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ফিলিস্তিন প্রশ্নে ডেভিড বেন-গুরিয়নের সেই ভুল ভবিষ্যদ্বাণী

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৫, ২০২৬, ১১:২৬ পিএম

ফিলিস্তিন প্রশ্নে ডেভিড বেন-গুরিয়নের সেই ভুল ভবিষ্যদ্বাণী

Ai - ছবি

১৯৪৮ সালে যখন ইউরোপীয় ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপক জাতিগত নিধন শুরু করেছিল, তখন তারা ভেবেছিল ফিলিস্তিনিরা তাদের সবচেয়ে ছোট সমস্যা হবে। ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং ইহুদি এজেন্সির তৎকালীন চেয়ারম্যান ডেভিড বেন-গুরিয়ন বিশ্বাস করতেন যে ‘শরণার্থী সমস্যাটি সময়ের সাথে নিজেই সমাধান হয়ে যাবে’। ইহুদিবাদী নেতাদের ধারণা ছিল ফিলিস্তিনিদের কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিচয় নেই এবং তারা প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে পালিয়ে গিয়ে সেখানেই মিশে যাবে। তারা ভেবেছিল এই মানুষগুলো আর কখনো তাদের লুণ্ঠিত জমি দাবি করতে ফিরে আসবে না।

বেন-গুরিয়নের সেই ভবিষ্যদ্বাণী আজ ইতিহাসের অন্যতম বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত।

দশকের পর দশক পার হলেও ফিলিস্তিনি জাতীয় অধিকারের দাবি কেবল জোরালোই হয়েছে। আজ ১৯৪৮ সালের নাকবার প্রত্যক্ষদর্শী বা বেঁচে থাকা মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা, কিন্তু ফিলিস্তিনি অধিকার ও ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার আগের চেয়েও শক্তিশালী। এর কারণ হলো পুরনো প্রজন্ম তাদের সন্তানদের ট্রমা ভুলে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেয়নি; বরং তারা শিখিয়েছে মনে রাখতে এবং তাদের পৈতৃক বাড়ির চাবিগুলো স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রাখতে। ফিলিস্তিনিদের হার না মানা মনোভাব এবং ইসরায়েলের ক্রমাগত সহিংস ও উচ্ছেদ নীতি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের বিরুদ্ধেই কাজ করেছে।

ইসরায়েল যত বেশি জমি দখল করেছে, ফিলিস্তিনি চেতনা নিয়ন্ত্রণে তারা তত বেশি ব্যর্থ হয়েছে। শরণার্থী শিবিরগুলোকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে শরণার্থী বিষয়টিকে কেবল মানবিক সংকটে রূপ দেওয়ার সব প্রচেষ্টাই ভেস্তে গেছে। যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তারাই আজ প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় শক্তি। প্রতিটি শরণার্থী শিবির আজ মুক্তিকামী মানুষের কেন্দ্রবিন্দু। গাজা উপত্যকা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ, যেখানে জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই শরণার্থী। ইসরায়েল আজ নিজেই স্বীকার করছে যে ফিলিস্তিনিদের চতুর্থ প্রজন্ম তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি—যা বেন-গুরিয়নের পূর্বাভাসের চূড়ান্ত ব্যর্থতা।

ইসরায়েল আজ তার নিজের পাশবিক শক্তির ফাঁদে আটকা পড়েছে। তারা যত বেশি হত্যাযজ্ঞ ও উচ্ছেদ চালাচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের সংকল্প তত বেশি দৃঢ় হচ্ছে। গাজা গণহত্যা এই মরণফাঁদের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে, আহত হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১৯ লাখ মানুষ। ঘরবাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও প্রতিটি তাবুতে জন্ম নেওয়া শিশুটি বড় হচ্ছে এক কঠিন সত্য উপলব্ধি করে—কারা তার বাড়ি কেড়ে নিয়েছে এবং ন্যায়বিচার পেতে কী করতে হবে।

ইসরায়েলি নিষ্ঠুরতার নেতিবাচক প্রভাব কেবল ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলের এই অভিযান ফিলিস্তিন ইস্যুকে পশ্চিমা বিশ্বের প্রান্তিক রাজনীতি থেকে বের করে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা আজ ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রশ্নে আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। বেন-গুরিয়ন ভেবেছিলেন স্মৃতি মুছে যাবে, কিন্তু ইতিহাস বলছে ফিলিস্তিনিরা তাদের মাটি ও পরিচয়ের লড়াইয়ে এক চুলও নড়েনি।

banner
Link copied!