ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় একে একে পরিবারের ৭০ জন সদস্যকে হারানোর পরও নিজের জন্মভূমি ছাড়তে নারাজ ৯৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী ফাতেমা ওবাইদ। ১৯৪৮ সালের ঐতিহাসিক নাকবা বা মহাবিপর্যয়ের এই প্রত্যক্ষদর্শী গাজায় চলমান ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, প্রথম নাকবায় মানুষ কেবল ঘরবাড়ি ও জমি হারিয়েছিল, কিন্তু এবার তারা হারিয়েছে পুরো একটি ইতিহাস।
ফাতেমা ওবাইদ বর্তমানে গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের একটি পরিত্যক্ত ভবনে নাতি-নাতনিদের নিয়ে কোনোমতে আশ্রয় নিয়েছেন।
সেখান থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানান, গাজায় অসংখ্য মানুষের পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন সব কোমলমতি শিশু ও তরুণ হারিয়ে গেছে, যাদের ক্ষতি আগামী কয়েক দশকেও পূরণ হওয়া অসম্ভব। ১৯৪৮ সালে জায়নবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যা করতে পারেনি, বর্তমান ইসরায়েলি বাহিনী এখন সেটাই বাস্তবায়ন করছে। ফাতেমার জন্ম গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকায়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় লাখো ফিলিস্তিনির মতো তাঁকেও সাময়িকভাবে ঘর ছাড়তে হয়েছিল।
কয়েক মাস পর যুদ্ধবিরতি হলে তিনি শুজাইয়ায় ফিরে এলেও ৭৫ বছর পর আবারও নির্মমভাবে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামলায় তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। বারবার উচ্ছেদের মুখে পড়ে গত আড়াই বছরে অন্তত ১০ বার তাকে আশ্রয় বদলাতে হয়েছে। বোমায় তাঁর ছেলে, নাতি-নাতনিসহ পরিবারের ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হলেও তিনি দক্ষিণ গাজায় পালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের নাকবায় প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন এবং নিহত হন ১৫ হাজার মানুষ। সেখানে চলমান গাজা যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জীবনের শেষ সময়ে এসে ফাতেমার কাছে তাঁর অতীত জীবনের স্মৃতি বলতে টিকে আছে কেবল এক জোড়া সোনার কানের দুল, যা ছোটবেলায় তাঁর বাবা উপহার দিয়েছিলেন। নিজের মাটি থেকে উপড়ে যাওয়া এবং উদ্বাস্তু অবস্থায় মৃত্যুর অপেক্ষা করার চেয়ে কষ্টের আর কিছু নেই বলে এই বৃদ্ধা জানান।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর এবং মিডল ইস্ট আই
