ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস জোটের দুই দিনব্যাপী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছে। সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দেওয়ায় একটি ঐক্যমতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন নেতারা। বর্তমান সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে ভারত শুক্রবার এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি নবীন সদস্য হিসেবে ইথিওপিয়া, মিশর, ইরান, ইন্দোনেশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন।
বৈঠকের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানের যুদ্ধ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বৃহস্পতিবার সদস্য দেশগুলোর কাছে দাবি জানিয়েছিলেন যেন তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন’-এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এবং কড়া নিন্দা জানায়। তবে ইরানের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আরাগচি অভিযোগ করেছেন যে, একটি নির্দিষ্ট দেশ ভারতের দেওয়া বিবৃতিতে ইরান সংক্রান্ত কিছু অংশ ব্লক করে দিয়েছে। যদিও তিনি সরাসরি আমিরাতের নাম নেননি, তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে ইরান কেবলমাত্র মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেই হামলা চালিয়েছে, যা দুর্ভাগ্যবশত ওই নির্দিষ্ট দেশের মাটিতে অবস্থিত।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধি খলিফা বিন শাহিন আল মারার এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি আরাগচির বক্তব্যকে ‘সন্ত্রাসী হামলার সাফাই’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন যে ইরান এ পর্যন্ত আমিরাতে প্রায় ৩ হাজার বার ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের জেরে সম্মেলনের কূটনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং একটি সাধারণ ঘোষণাপত্র তৈরি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ব্রিকস জোটের নতুন সম্প্রসারণের পর এটাই ছিল বড় ধরণের কোনো রাজনৈতিক সংকটের প্রথম সরাসরি বহিঃপ্রকাশ।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে অনৈক্য থাকলেও গাজা সংকট এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার নিয়ে জোটের মধ্যে কিছুটা ঐকমত্য দেখা গেছে। ভারত তার বিবৃতিতে জানিয়েছে, ব্রিকস সদস্যরা জাতিসংঘ এবং নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে যেন গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ে। গাজা সম্পর্কে সম্মেলনে একমত হওয়া গেছে যে এটি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে এবং পশ্চিম তীরের সঙ্গে একে একীভূত করা জরুরি। তবে এখানেও একটি নামহীন দেশ গাজা বিষয়ক কিছু শর্তে আপত্তি জানিয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুদান ও সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়েও সম্মেলনে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সুদানে চলমান মানবিক বিপর্যয় রুখতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া সিরিয়ার রাজনৈতিক উত্তরণ এবং দেশটিতে বিদেশি সন্ত্রাসীদের নির্মূল করার বিষয়ে সদস্যরা একমত হয়েছেন। ব্রিকস জোটের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের নিন্দা জানানো হলেও ইরানের যুদ্ধের ছায়া পুরো সম্মেলনকেই ম্লান করে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর ছাড়াই শেষ হয়েছে এই হাই-প্রোফাইল কূটনৈতিক সমাবেশ।
