যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠেয় ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে উন্মাদনা তুঙ্গে পৌঁছেছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে এবং রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচের এই মেগা টুর্নামেন্টটি শুধু আয়োজনের পরিধিই বাড়াচ্ছে না, বরং ফুটবল ইতিহাসের বেশ কিছু শতাব্দী প্রাচীন ও কিংবদন্তিতুল্য রেকর্ডকে ভেঙে চুরমার করার মঞ্চ তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষক ও ক্রীড়া সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের আসরে খেলোয়াড় ও কোচদের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স এবং সামগ্রিক টুর্নামেন্টের গোল সংখ্যায় এমন কিছু পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। বিশেষ করে লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমের সামনে রয়েছে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম নতুন করে লেখার এক অনন্য সুযোগ।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ১৭টি ম্যাচ জয়ের একক রেকর্ডটি দীর্ঘদিন ধরে নিজের দখলে রেখেছেন জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসা। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসি বর্তমানে ১৬টি জয় নিয়ে ক্লোসার ঠিক পেছনেই অবস্থান করছেন। আগামী মাসে শুরু হতে যাওয়া এই আসরের গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা যদি অন্তত দুটি ম্যাচে জয়লাভ করতে পারে, তবে ক্লোসাকে টপকে মেসিই হয়ে যাবেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও সর্বোচ্চ ম্যাচজয়ী খেলোয়াড়।
একই সঙ্গে লিওনেল মেসি, পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং মেক্সিকোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গুইলার্মো ওচোয়া যদি এই আসরে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্যও মাঠে নামেন, তবে তারা ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার এক বিরল ও অনন্য কীর্তি স্থাপন করবেন। এর আগে পৃথিবীর কোনো ফুটবলার ছয়টি ভিন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ আসরে খেলার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি।
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ গোলের সিংহাসনটিও এবার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬টি গোল করে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন। বর্তমানে লিওনেল মেসির ঝুলিতে রয়েছে ১৩টি গোল এবং ফ্রান্সের গতিদানব কিলিয়ান এমবাপ্পের সংগ্রহে রয়েছে ১২টি গোল। ক্লোসার এই রেকর্ডটি ভাঙতে মেসির প্রয়োজন আর মাত্র ৪টি গোল এবং এমবাপ্পের দরকার ৫টি গোল। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, কিলিয়ান এমবাপ্পের বর্তমান ফর্ম, বয়স এবং গোল করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কথা বিবেচনা করলে এবারের আসরেই ক্লোসার দীর্ঘদিনের অক্ষুণ্ন সিংহাসনটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচদের বিশ্ব রেকর্ডের তালিকাতেও একটি বড় ধরনের ওলটপালট ঘটার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় ৪৮ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে জার্মানির সাবেক সফল কোচ হেলমুট শনের বিশ্বকাপে ১৬টি ম্যাচ জয়ের ঐতিহাসিক রেকর্ডটি কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। ফ্রান্সের বর্তমান দূরদর্শী কোচ দিদিয়ের দেশম ১৪টি জয় নিয়ে হেলমুট শনের এই রেকর্ডের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন। ফরাসি দল যদি এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে বা পরবর্তী রাউন্ডে অন্তত দুটি ম্যাচ জিততে পারে তবে দেশম এই রেকর্ডে সমতা আনবেন এবং তিনটি ম্যাচে জয় পেলে তিনি হেলমুট শনের দীর্ঘদিনের রেকর্ডটি ভেঙে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কোচের মর্যাদায় ভূষিত হবেন।
ব্যক্তিগত রেকডর্র পাশাপাশি দলগত এবং সামগ্রিক টুর্নামেন্টের গোলের ক্ষেত্রেও ২০২৬ বিশ্বকাপ এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও ৬৪টি ম্যাচে মোট ১৭২টি গোল হয়েছিল, যা ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। তবে এবার দল সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ম্যাচের সংখ্যা এক লাফে আরও ৪০টি বেড়ে ১০৪-এ উন্নীত হয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ম্যাচে গোলের গড় যদি গত আসরের চেয়ে তুলনামূলক কমও হয়, তবুও কাতার বিশ্বকাপের ১৭২ গোলের রেকর্ডটি অনায়াসে ভেঙে যাবে। স্পোর্টস ডাটা অ্যানালিস্টদের ধারণা, এবারের টুর্নামেন্টে মোট গোলের সংখ্যা খুব সহজেই ২০০ এর কোটা ছাড়িয়ে যাবে, যা এই আসরকে ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং গোলবন্যা দেখা ফুটবল উৎসবে পরিণত করবে।
