রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কাঁটাতারের জীবন থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ তারকা মাবিলের গল্প

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৪, ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

কাঁটাতারের জীবন থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ তারকা মাবিলের গল্প

ছবি : সংগৃহীত

দক্ষিণ সুদানের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরা এবং কেনিয়ার শরণার্থী শিবিরে বড় হওয়া উইঙ্গার আউয়ার মাবিলে বর্তমানে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অদম্য সাহসের প্রতীক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন বলে রবিবার এক বিশেষ ক্রীড়া প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে আল জাজিরা এবং রয়টার্স। কাঁটাতারের বেষ্টনীতে ঘেরা জীবন থেকে শুরু করে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে পৌঁছানোর এই অবিশ্বাস্য কাহিনী কেবল একজন সাধারণ ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি হলো মানুষের অদম্য ইচ্ছা ও স্বপ্নের এক জয়গান। কেনিয়ার কাকুমা শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ফুটবলার আজ বিশ্বমঞ্চে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের এক অনন্য অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়েছেন।

মাবিলের শৈশবকাল কেটেছে চরম দারিদ্র্য, তীব্র মানবিক সংকট এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। তার আদি পরিবার যুদ্ধবিধ্বস্ত দক্ষিণ সুদান থেকে নিজেদের জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসে কেনিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাকুমা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল। ধুলোবালি আর চরম খাদ্য সংকটের সেই বৈরী পরিবেশে মাবিল ও তার পরিবারকে প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই করতে হতো যেখানে মাথার ওপর সুনির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী ছাদ বা পানীয় জলের পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না। তবে এই চরম কষ্টের মাঝেও ফুটবল ছিল মাবিলের একমাত্র আনন্দ, মানসিক মুক্তি এবং চারপাশের কঠোর বাস্তবতাকে ভুলে থাকার প্রধান মাধ্যম। প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা না থাকায় তিনি প্লাস্টিকের ব্যাগ অথবা পুরনো মোজা একসাথে পেঁচিয়ে কৃত্রিম বল তৈরি করতেন এবং তা দিয়েই খালি পায়ে বন্ধুদের সাথে ধুলোমাখা মাঠে খেলতেন।

can জীবনের এক বড় মোড় আসে যখন মাবিলের বয়স মাত্র ১০ বছর ছিল এবং এক বিশেষ আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা প্রকল্পের আওতায় তার পরিবারকে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। দক্ষিণ গোলার্ধের এই নতুন দেশে আসার পর তাদের আবাসন নিশ্চিত হয় দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড শহরে। একটি সম্পূর্ণ নতুন সমাজ, অপরিচিত ভাষা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নেওয়া ১০ বছরের একটি শিশুর জন্য মোটেও সহজসাধ্য কাজ ছিল না। জীবনের এই প্রাথমিক রূপান্তরকালীন সময়ে ফুটবল আবারও মাবিলের সবচেয়ে বড় আশার আলো এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়। স্থানীয় যুব ক্লাবের হয়ে খেলার সময় তার অসাধারণ গতি ও ড্রিবলিং দক্ষতা খুব দ্রুতই পেশাদার কোচদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের হয়ে পেশাদার ফুটবল লিগে চমৎকার অভিষেকের পর মাবিলের জন্য ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়। তিনি ডেনমার্কের শীর্ষ সারির ক্লাব এফসি মিডটজিল্যান্ডে যোগ দেন যেখানে তিনি ঘরোয়া লিগের গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা জেতার পাশাপাশি ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার এক অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে এই গতিময় উইঙ্গার পর্তুগাল, স্পেন, তুরস্ক এবং সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন এবং নিজেকে আন্তর্জাতিক স্তরে একজন দক্ষ ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের এই বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে আরও পরিপক্ব ও শক্তিশালী করে তোলে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাবিলের যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালে যখন তিনি প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ফুটবল দল বা সকারুজের জার্সি গায়ে জড়ানোর সুযোগ পান। এর পর থেকে তিনি জাতীয় দলের আক্রমণভাগের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফ ম্যাচে পেরুর বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে নেওয়া তার সেই ঐতিহাসিক ও জয়সূচক পেনাল্টি গোলটি অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে খেলার টিকিট এনে দিয়েছিল। সেই অবিশ্বাস্য ও আবেগঘন মুহূর্তের কথা স্মরণ করে মাবিল সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে তার পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্র ও জনগণকে ধন্যবাদ জানানোর এর চেয়ে সুন্দর উপায় তার জানা ছিল না।

যা কম স্পষ্ট তা হলো শৈশবের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা এবং শরণার্থী শিবিরের ভয়াবহ স্মৃতি একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলে। আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতার তীব্র মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে মাবিলের মতো খেলোয়াড়দের ভেতরের মানসিক শক্তি অনেক বেশি কাজ করে, কারণ তারা জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম পরিস্থিতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তবে মাঠের বাইরের এই লড়াই একজন খেলোয়াড়কে প্রতিনিয়ত তার নিজের অতীতের সাথে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে যা সাধারণ দর্শকদের চোখে সবসময় ধরা পড়ে না।

মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাবিল সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের প্রতি নিজের গভীর দায়বদ্ধতা সবসময় বজায় রেখেছেন। তিনি তার আপন ভাইয়ের সাথে যৌথভাবে গড়ে তুলেছেন ‘বেয়ারফুট টু বুটস’ নামের একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য ফাউন্ডেশন। এই মানবিক সংস্থাটি মূলত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের শরণার্থী শিবিরে থাকা শিশুদের জন্য উন্নত খেলাধুলার সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা এবং শিক্ষামূলক মানবিক সাহায্য প্রদান করে থাকে। নিজের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত কেনিয়ার কাকুমা শিবিরে নিজে ফিরে গিয়ে তিনি এই মহৎ উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন যা বর্তমানে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে যখন ১১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত জীবনযাপন করছেন, তখন আউয়ার মাবিলের এই জীবনসংগ্রাম এক নতুন আশার আলো দেখায়। তিনি বিশ্বকে দেখীদের দেখিয়েছেন যে জীবনের শুরুটা যেখানেই হোক না কেন, কঠোর পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে যেকোনো বাধা অতিক্রম করে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তার প্রতিটি ম্যাচ কেবল ফুটবল খেলার অংশ নয়, বরং এটি হলো বিশ্বজুড়ে থাকা লাখো শরণার্থীর অধিকার ও স্বপ্নের এক জীবন্ত প্রতীক যা ফুটবল ভক্তদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে চলেছে।

banner
Link copied!