শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩

ব্রাজিলের জোগা বনিতো ফুটবল শৈলী হারিয়ে যাওয়ার কারণ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৯, ২০২৬, ১০:৫২ পিএম

ব্রাজিলের জোগা বনিতো ফুটবল শৈলী হারিয়ে যাওয়ার কারণ

ছবি : সংগৃহীত

বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সুন্দর খেলার শৈলী গত দুই দশক ধরে ম্লান হয়ে পড়েছে বলে রয়টার্স এবং আল জাজিরা শুক্রবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে। একসময় ব্রাজিলিয়ান ফুটবল মানেই ছিল মাঠে এক চমৎকার শৈল্পিক প্রদর্শনী যা বিশ্বজুড়ে ব্রাজিলের জোগা বনিতো নামে পরিচিত ছিল। হলুদ জার্সি গায়ে বল পায়ে মাঠের ভেতর নান্দনিক নাচ, অপ্রত্যাশিত ড্রিবলিং এবং হাসিমুখে আক্রমণ পরিচালনা করা কেবল একটি খেলার ধরন ছিল না caravan এটি ছিল সাম্বার দেশের এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয়। পেলে, গ্যারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদো কিংবা রোনালদিনহোর মতো কিংবদন্তিরা বিশ্ববাসীকে শিখিয়েছিলেন যে ফুটবল কেবল ম্যাচ জেতার জন্য নয় বরং সুন্দরভাবে মন জয় করারও একটি পরম শিল্প।

তবে বিগত ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে শেষবারের মতো শিরোপা জয়ের পর দীর্ঘ ২৪ বছর কেটে গেলেও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আর সোনালি ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। এরপর অনুষ্ঠিত ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের প্রতিটি বিশ্বকাপেই ব্রাজিলকে অন্যতম ফেভারিট বা শিরোপার দাবিদার মনে করা হলেও প্রতিবারই তাদের বিদায় নিতে হয়েছে চরম হতাশায়। বিশেষ করে ২০০৬ সালে রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা এবং আদ্রিয়ানোর মতো তারকাসমৃদ্ধ দল নিয়েও কোয়ার্টার ফাইনালের আগে ফ্রান্সের কাছে হেরে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। একইভাবে ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে ঐতিহাসিক ৭-১ গোলের অভাবনীয় বিপর্যয় এবং পরবর্তী সময়ে বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার ঘটনাগুলো সাম্বার সুরকে প্রতিনিয়ত ম্লান করেছে।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে ব্রাজিলের জোগা বনিতো শৈলী হারিয়ে যাওয়ার পেছনে আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত পরিবর্তন একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান যুগের ফুটবল এখন উচ্চগতির প্রেসিং, শক্তিশালী রক্ষণভাগ সংগঠন এবং কঠোর কৌশলগত শৃঙ্খলার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যার ফলে সত্তর বা আশির দশকের মতো মুক্তভাবে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলা এখন বেশ কঠিন। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলীয় কাঠামোগত শৃঙ্খলা এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় খেলোয়াড়দের স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ অনেকাংশে কমে গেছে। এছাড়া ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী খেলোয়াড় তৈরির আদি সংস্কৃতি বা রাস্তার ফুটবলও এখন আগের মতো সচল নেই যা একসময় প্রতিভার মূল কারখানা হিসেবে কাজ করত।

পূর্ববর্তী সময়ে ব্রাজিলের বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাট, সমুদ্র সৈকত এবং ফাভেলাগুলোতে শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনানুষ্ঠানিক ফুটবল খেলত যা তাদের ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতা তৈরিতে সাহায্য করত। কিন্তু দ্রুত নগরায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা সমস্যা এবং আধুনিক একাডেমি ফুটবলের প্রসারের ফলে সেই স্বতঃস্ফূর্ত রাস্তার ফুটবল সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তির পথে। বর্তমান যুগের উদীয়মান সেরা ব্রাজিলিয়ান প্রতিভারা অত্যন্ত অল্প বয়সেই অর্থাৎ মাত্র ১৭ বা ১৮ বছর বয়সেই ইউরোপের পেশাদার ক্লাবগুলোতে চলে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে তারা কঠোর শারীরিক ফিটনেস এবং শৃঙ্খলাভিত্তিক ফুটবল কাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠার ফলে ফুটবলার হিসেবে পরিপূর্ণ হলেও সাম্বার সহজাত শৈল্পিকতা হারিয়ে ফেলছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো ব্রাজিলের এই বর্তমান প্রজন্ম আবার কখনো তাদের হারিয়ে যাওয়া সেই নান্দনিক খেলার ধারা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে পারবে কিনা। নেইমার, ভিনিসিউস জুনিয়র, রদ্রিগো কিংবা রাফিনহার মতো বিশ্বমানের প্রতিভার কোনো অভাব বর্তমান দলে নেই এবং তারা ইউরোপীয় ফুটবলেও নিয়মিত সাফল্য পাচ্ছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত দুই দশকে ব্রাজিল ২০০৭ ও ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা শিরোপা জয় করেছে এবং বেশ কিছু আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে রানার্সআপও হয়েছে। ফুটবলপ্রেমীরা এখনো গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন যে বল পায়ে ব্রাজিলের ফুটবলাররা আবার মাঠে নাচবেন এবং বিশ্বমঞ্চে আবারো ফিরে আসবে সেই হারিয়ে যাওয়া সুন্দর ফুটবলের ছন্দ।

banner
Link copied!