২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র এক মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের হসপিটালিটি বা আতিথেয়তা খাতে একটি অপ্রত্যাশিত সংকট দেখা দিয়েছে। আমেরিকার যে ১১টি শহরে বিশ্বকাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে হোটেল বুকিংয়ের হার প্রাথমিক পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশনের (এএইচএলএ) নতুন একটি জরিপের বরাত দিয়ে আল জাজিরা এবং এনপিআর জানিয়েছে, হোটেল মালিকরা যে বিপুল অর্থনৈতিক লাভের আশা করেছিলেন, তা আপাতত ম্লান হতে বসেছে।
এএইচএলএ-এর এই বিস্তৃত জরিপে সারাদেশের ২০০ জনেরও বেশি হোটেল মালিক ও অপারেটর অংশ নেন। জরিপের ফলাফল শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতির একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রায় ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে, তাদের বর্তমান রিজার্ভেশন বা বুকিংয়ের হার আগের অনুমানের চেয়ে বেশ নিচে অবস্থান করছে। বিশেষ করে বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, সান ফ্রান্সিসকো এবং সিয়াটলের মতো বড় শহরগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। অনেক হোটেল মালিক এই মেগা টুর্নামেন্টকে তাদের ব্যবসার জন্য একটি সাধারণ ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা বিদেশি পর্যটকদের ঢল নামার প্রাথমিক প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত।
আন্তর্জাতিক দর্শকদের এই অনাগ্রহের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন, বর্তমান প্রশাসনের কঠোর ভিসা নীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাই আন্তর্জাতিক ভক্তদের নিরুৎসাহিত করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে এই টুর্নামেন্টের গুরুত্ব নিয়ে বারবার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, কিন্তু তার প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি বিপরীত প্রভাব ফেলছে। এএইচএলএ উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়া, উচ্চ ফি এবং বিমানবন্দরে কঠোর তল্লাশির মুখোমুখি হতে হবে। এর পাশাপাশি, শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এর সাথে যদি টিকিটের চড়া দাম ও যাতায়াত খরচ যোগ করা হয়, তবে অনেক বিদেশি ভক্তের পক্ষেই সাধারণ হোটেলে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সরকারি নীতির বাইরে, হোটেল অপারেটররা এই পরিস্থিতির জন্য বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকেও আংশিকভাবে দায়ী করছেন। পরিকল্পনা পর্বের শুরুতে ফিফা আয়োজক শহরগুলোতে বিপুলসংখ্যক হোটেল রুম আগাম বুকিং করে রেখেছিল। কিন্তু সম্প্রতি ফিফা এই রিজার্ভেশনের একটি বড় অংশ বাতিল করে দেওয়ায় বাজারে হঠাৎ করে হাজার হাজার রুম খালি হয়ে যায়। হোটেল মালিকরা এনপিআর-কে জানিয়েছেন, ফিফার এই গণ-বুকিং একটি কৃত্রিম চাহিদার সংকেত তৈরি করেছিল, যার ফলে তারা আগেই রুমের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন রুমগুলো সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও প্রত্যাশিত বুকিং পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে ফিফা এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিফার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রুমগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বড় আকারের ক্রীড়া ইভেন্টগুলোতে এ ধরনের পদক্ষেপ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। ফিফা জানিয়েছে, এবারের বিশ্বকাপের প্রতি বিশ্বজুড়ে মানুষের আগ্রহ নজিরবিহীন এবং ইতোমধ্যে ৫০ লাখেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছে। তবে টিকিট বিক্রি হলেও তা কেন হোটেল বুকিংয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ভক্তরা হয়তো হোটেলের বদলে শর্ট-টার্ম রেন্টাল বা পরিচিতদের বাসায় থাকার বিকল্প বেছে নিচ্ছেন।
অবশ্য সব আয়োজক শহরের চিত্র এতটা হতাশাজনক নয়। আটলান্টায় জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক হোটেল মালিক জানিয়েছেন, তাদের বুকিং প্রত্যাশা অনুযায়ী বা তার চেয়েও ভালো হচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ামি মেট্রো এলাকার ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি বুকিং পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে যে বিপুল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা হোঁচট খাচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক হোটেল মালিক বিশ্বকাপকেন্দ্রিক তাদের প্রচারণামূলক বিনিয়োগ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন।
আগামী ১১ জুন মেক্সিকো সিটিতে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এবং ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে হবে ফাইনাল। শেষ মুহূর্তে বুকিং বাড়ার সুযোগ ক্রমশই কমে আসছে। এএইচএলএ সভাপতি রোজানা মায়েত্তা জোর দিয়ে বলেছেন, এই মেগা ইভেন্ট থেকে পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং ফিফাকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক পর্যটকরা একটি বাধাহীন ও চমৎকার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পান।
