রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু খাবার

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৭, ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু খাবার

বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় এক নতুন পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। গবেষকরা এখন খাদ্য শিল্পের বর্জ্য বা ফেলে দেওয়া অংশগুলোকে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সুস্বাদু খাদ্যে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। বিবিসি নিউজের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি ল্যাবে খাদ্য বর্জ্য ব্যবহার করে পনিরের মতো সুস্বাদু পণ্য তৈরি করা হয়েছে। বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার ভায়ু হিল-মেইনি এবং তার গবেষক দল ছত্রাকের গাঁজন বা ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে এই নতুন খাদ্য উদ্ভাবন করেছেন। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত পণ্যটির স্বাদ অনেকটা পারমেজান বা পেকোরিনো পনিরের মতোই।

গাঁজন বা ফারমেন্টেশন মূলত একটি জৈবিক প্রক্রিয়া, যেখানে অণুজীব শর্করা বা স্টার্চের মতো কার্বোহাইড্রেটকে অ্যালকোহলের মতো বিভিন্ন উপাদানে রূপান্তরিত করে। এই প্রক্রিয়াটি ঐতিহাসিকভাবে বেকিং এবং মদ তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে আধুনিক জৈবপ্রযুক্তির সহায়তায় কোম্পানিগুলো খাদ্য শিল্পের উপজাত বা বর্জ্য পদার্থগুলো সংগ্রহ করছে, যেগুলো এতদিন ফেলে দেওয়া হতো বা খুব কম মূল্যে বিক্রি হতো। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা এগুলোকে সাবস্ট্রেট হিসেবে ব্যবহার করে এমন কিছু তৈরি করছেন যা মানুষের ভোগের জন্য উপযুক্ত।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফার্মটেক নামক একটি প্রতিষ্ঠান কোকো বিন থেকে চকোলেট তৈরির পর অবশিষ্ট অংশ বা কোকো শেলের ওপর কাজ করছে। সাধারণত এই খোসাগুলো ফেলে দেওয়া হয়, কিন্তু নতুন প্রযুক্তিতে এগুলোকে গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোকো পাউডারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফার্মটেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যান্ডি ক্লেটন জানান, খাদ্য শিল্পের এই উপজাতগুলোকে পুড়িয়ে ফেলা বা সার হিসেবে ব্যবহার না করে অণুজীবের মাধ্যমে ভেঙে মানুষের ব্যবহারযোগ্য খাদ্যে রূপান্তর করা সম্ভব। এর মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হওয়া যায়।

মটরশুঁটি প্রোটিনের একটি জনপ্রিয় উৎস, তবে মটরশুঁটির বিশাল একটি অংশ প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় বর্জ্য হিসেবে থেকে যায়। স্পেনের মোয়া ফুডটেক নামক কোম্পানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে এই সমস্যার সমাধান খুঁজছে। তারা বিভিন্ন ধরনের অণুজীবের জিনোম বিশ্লেষণ করে এমন কম্বিনেশন তৈরি করছে যা বর্জ্য থেকে সর্বোচ্চ মানের প্রোটিন বা খাদ্য উপাদান তৈরি করতে পারে। তাদের প্ল্যাটফর্ম এখন প্রতি ঘণ্টায় শত শত বায়ো-প্রসেস তৈরি করতে সক্ষম, যা আগে কয়েক সপ্তাহ সময় নিত।

জার্মানির মাইক্রোহার্ভেস্ট নামক একটি প্রতিষ্ঠান চিনির কারখানা থেকে পাওয়া মোলাসেস বা চিটাগুড় ব্যবহার করে পোষা প্রাণীর খাবার তৈরির প্রক্রিয়ায় কাজ করছে। সাধারণত এই চিটাগুড় গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু নতুন প্রযুক্তিতে একে আরও উন্নত মানের খাবারে রূপান্তর করা হচ্ছে। মাইক্রোহার্ভেস্টের তৈরি এই খাদ্যপণ্যে এক ধরনের উমামি স্বাদ পাওয়া যায়, যা উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের তিক্ততা কমিয়ে আনে।

সিঙ্গাপুরের মোট্টানাই ফুডটেক এমন সব উপাদান নিয়ে কাজ করছে যা সাধারণত অবহেলিত বা কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। তাদের নামের অনুপ্রেরণা এসেছে জাপানি শব্দ মোট্টানাই থেকে, যার অর্থ অপচয় না করা। এই কোম্পানিগুলো বর্জ্যকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে খাদ্য শৃঙ্খলে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিবেশগত প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

banner
Link copied!