বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীর প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা এক লাখ কোটি মার্কিন ডলারের মালিক হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন বলে শনিবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিশ্চিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার রকেট নির্মাতা ও স্যাটেলাইট অপারেটর কোম্পানি স্পেসএক্স পাবলিক বা শেয়ার বাজারে উন্মুক্ত হওয়ার পর তার মোট সম্পদ বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে কোনো একক ব্যক্তির এক লাখ কোটি ডলারের মালিক হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। ব্লুমবার্গের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে তার নিট সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় এক কোটি ৩৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫১৬ কোটি টাকার সমান। তবে এই বিপুল সম্পদের সিংহভাগই স্পেসএক্সের শেয়ারের মূল্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাজারের উত্থান-পতনের সাথে এই মর্যাদা পরিবর্তিত হতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেওয়া এই উদ্যোক্তা ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ ব্যবসায়িক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন এবং মাত্র ১২ বছর বয়সে নিজের তৈরি প্রথম কম্পিউটার গেম বিক্রি করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পড়াশোনার জন্য প্রথমে কানাডা এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান যেখানে তিনি পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি দুটি প্রযুক্তি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন যার মধ্যে অনলাইন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে পেপ্যালে রূপান্তরিত হয় এবং ২০০২ সালে তা বিপুল অর্থে বিক্রি হয়। সেই লভ্যাংশ তিনি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিকল্প হিসেবে স্পেসএক্স গঠনে বিনিয়োগ করেন এবং ২০০৮ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে তিনি ৪৪ বিলিয়ন ডলারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার ক্রয় করেন যা বর্তমানে এক্স নামে পরিচিত হলেও এর বাজারমূল্য হ্রাস পেয়ে ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি খাতেও ইলন মাস্ক অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছেন এবং তিনি বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির মূল কোম্পানিতে প্রাথমিক বিনিয়োগকারী ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তিনি সেই প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক হয়ে যান এবং ২০২৩ সালে এক্সএআই নামে নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন যার লক্ষ্য মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করা। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মার্কিন অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ politics বা রাজনীতিতে তার সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জয়ী করতে তিনি আর্থিক ও কৌশলগতভাবে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন যা অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল। এক্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনমত ও আন্তর্জাতিক আলোচনাকে তিনি যেভাবে প্রভাবিত করছেন তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও রাজনীতিবিদদের তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনবার বিবাহবিচ্ছেদ घটা এই ধনকুবেরের বর্তমানে ১৪ জন সন্তান রয়েছে এবং তিনি বিভিন্ন সময় বৈশ্বিক জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় নিজের আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। তার প্রথম স্ত্রীর গর্ভে ছয় সন্তান, কানাডীয় সংগীতশিল্পী গ্রাইমসের সাথে তিন সন্তান, নিউরোলিংক নির্বাহীর সাথে চার সন্তান এবং একজন ইনফ্লুয়েন্সারের গর্ভে এক সন্তান জন্ম নেয়। যা কম স্পষ্ট তা হলো তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত বিতর্কগুলো তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বকে কতটা ঝুঁকিতে ফেলবে কারণ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ডিপফেক তৈরির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। টেসলা কোম্পানি থেকে আরও বিপুল পরিমাণ আর্থিক বোনাস পাওয়ার সুযোগ রয়েছে তার যদি তিনি কোম্পানির বাজারমূল্য আটগুণ বৃদ্ধি এবং এক কোটি ২০ লাখ গাড়ি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেন। সামগ্রিকভাবে ইলন মাস্কের এই অভূতপূর্ব সম্পদ অর্জন মানব ইতিহাসের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
