ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল মোকাবেলায় এবার মানুষের বিকল্প হিসেবে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগালে সাম্প্রতিক সময়ে দাবানলের কারণে লাখ লাখ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল ফ্রান্সের জিরোন্দ অঞ্চলে ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি পাইন বন ও পর্যটন এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা এপি। এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে আগুন দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ক্যামেরা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, যা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।
বিবিসি নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের জিরোন্দ অঞ্চলে নজরদারি টাওয়ারে থাকা মানব পাহারাদারদের জায়গা সম্পূর্ণভাবে নিয়ে নিয়েছে এই অত্যাধুনিক ক্যামেরাগুলো। সিএফডিটি ইউনিয়নের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার শাখার প্রধান এবং চব্বিশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দমকলকর্মী গিয়োম মিলেট জানান, আগুন নেভানোর মূল কৌশলে খুব বেশি পরিবর্তন না এলেও শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। নতুন এই ক্যামেরাগুলো বিশ কিলোমিটার দূর থেকেই আগুনের সূত্রপাত স্পষ্টভাবে শনাক্ত করতে পারে। অতীতে মাঠে কাজ করা ট্রাক্টর থেকে ওড়া ধুলো এবং আগুনের ধোঁয়ার মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে অনেক সময় ভুল সংকেত আসত। কিন্তু বর্তমান এআই প্রযুক্তি প্রায় শতভাগ নির্ভুলভাবে আসল ধোঁয়া শনাক্ত করতে সক্ষম।
ফ্রান্সে এই গ্রীষ্মে দাবানল নেভাতে গিয়ে এরই মধ্যে চারজন দমকলকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও দেড় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এই প্রযুক্তিটি দমকল বাহিনীর জন্য বড় সহায়ক হয়ে উঠেছে। জিরোন্দ অঞ্চলে এই ব্যবস্থাটি স্থাপন করেছে ‘মিডগার্ড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে ফ্রান্সের অন্যান্য অঞ্চলে একই ধরনের কাজ করছে ফরাসি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ফায়ারট্র্যাকিং’।
ফায়ারট্র্যাকিং-এর প্রধান নির্বাহী জ্যঁ-সিমোন শোদিয়ে প্রযুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, সিস্টেমটি আগুন শনাক্ত করার সাথে সাথেই দমকলকর্মীদের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা চলে যায়। অ্যাপের মাধ্যমে তারা চল্লিশ গুণ জুম করে সরাসরি ঘটনাস্থলের বাস্তব চিত্র দেখতে পান। এর পাশাপাশি বাতাসের আর্দ্রতা এবং আবহাওয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আগুন কীভাবে ছড়াবে, তার একটি নিখুঁত ডিজিটাল মানচিত্রও পাওয়া যায়।
সময়ের এই হিসাবটি দাবানল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শোদিয়ে আরও জানান, গত কয়েক দিনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ জরুরি সেবায় ফোন করার অন্তত পনেরো মিনিট আগেই তাদের সিস্টেম আগুনের সংকেত দিতে পেরেছে। একটি আগুন শুরুর এক মিনিটের মধ্যে মাত্র এক গ্লাস পানি দিয়ে তা নেভানো সম্ভব। দুই মিনিট পর প্রয়োজন হয় এক ট্যাংক ভর্তি পানি। কিন্তু তিন মিনিট পার হয়ে গেলে ক্যানাডেয়ারের মতো উভচর উড়োজাহাজ ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। এই পনেরো মিনিটের সুবিধা একটি আগুনকে দুই বা তিন হেক্টরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে সাহায্য করে, যা নিশ্চিত বিপর্যয় রোধ করে।
ইসলামে মানুষের জীবন ও চারপাশের প্রকৃতি রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, "যে ব্যক্তি কারও প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমস্ত মানুষের প্রাণ রক্ষা করল" (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩২)। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে দাবানলের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে সাধারণ মানুষের জীবন, বন্যপ্রাণী ও বনভূমি রক্ষার এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা সেই পবিত্র বার্তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ইউরোপে এখন প্রতিনিয়ত ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ও দাবানল আঘাত হানছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য দেশেও হাজার হাজার দমকলকর্মী দিনরাত আগুন নেভানোর কাজ করে যাচ্ছেন। এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করাই এখন ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিস্তারিত পরিস্থিতি এখনো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
