বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

রোবট সার্ভারের বকশিশ দাবি ও মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে বিতর্ক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম

রোবট সার্ভারের বকশিশ দাবি ও মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে বিতর্ক

রোবট ও স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার পর বকশিশ আদায়ের নতুন প্রবণতা আন্তর্জাতিক পরিসরে তীব্র প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রেস্তোরাঁ, কফি শপ কিংবা বিমানবন্দরের বিক্রয়কেন্দ্রে মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করা যন্ত্রের পর্দায় এখন নিয়মিত বাড়তি বকশিশের আবেদন ভেসে উঠছে। আন্তর্জাতিক ওয়্যার সার্ভিস ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, সেবা খাতের এই আকস্মিক রূপান্তর কেবল গ্রাহকদের আর্থিক অস্বস্তিতে ফেলছে না, বরং এই অর্থ শেষ পর্যন্ত কার পকেটে যাচ্ছে তা নিয়েও অন্ধকার তৈরি হয়েছে।

যন্ত্রের সেবায় বকশিশ চাওয়ার এই চাপ দিন দিন স্পষ্ট রূপ নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের ভেনেশিয়ান হোটেলের একটি স্বয়ংক্রিয় বারে যন্ত্রের হাত দিয়ে ককটেল তৈরির পর বিলে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত সেবা ফি যুক্ত করা হয়। নিউইয়র্কের আর্টলি কফিতে রোবট বারিস্তার সেবায় কিংবা নেওয়ার্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কর্মীহীন দোকানে পানির বোতল কিনলেও যন্ত্রের পর্দায় বকশিশ নির্ধারণের বিকল্প আসে। একইভাবে ওরেগনের পোর্টল্যান্ডের একটি রেস্তোরাঁয় মানুষ খাবার অর্ডার নিলেও টেবিল পর্যন্ত খাবার এগিয়ে দেয় চাকা লাগানো একটি যান্ত্রিক বাহন। মানুষের জন্য সহমর্মিতায় মানুষ বকশিশ দিলেও যন্ত্রের মুখে অর্থ তুলে দিতে গিয়ে থমকে যাচ্ছেন ক্রেতারা।

মার্কিন শ্রম আইনে মানুষের পাওয়া বকশিশ কোনো মালিক বা ব্যবস্থাপক কেটে রাখতে পারেন না।

তবে যান্ত্রিক সেবার ক্ষেত্রে এই নিয়মের কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো নেই। সেবা খাতের বকশিশের ওপর গবেষণা করা লেহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হোলোনা ওকস জানান, কিছু অসাধু নিয়োগকর্তা রোবটের মাধ্যমে তোলা বকশিশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছেন বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ সর্বনিম্ন মজুরি ঘণ্টায় ৭ ডলার ২৫ সেন্ট হলেও যারা সরাসরি বকশিশ পান তাদের জন্য আইনত এই মজুরি মাত্র ২ ডলার ১৩ সেন্টে নামিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্কারের কারণে কর্মীদের এমন বঞ্চনা নিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করাও অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে দৃশ্যত রান্নাঘরে কর্মী কাজ করলেও ডিজিটাল পর্দার সেই অতিরিক্ত অর্থ মালিকের একাউন্টে চলে যাচ্ছে কিনা তা বোঝার কোনো উপায় সাধারণ গ্রাহকের হাতে নেই।

বিতর্কিত কিছু প্রতিষ্ঠান অবশ্য দাবি করেছে যে সংগৃহীত অর্থের শতভাগ কর্মীদের মধ্যেই বণ্টন করা হয়।

আর্টলি কফির বিষয়বস্তু পরিচালক অ্যাবিগেইল স্মাথার্স জানান, গ্রাহকদের অসন্তোষের মুখে তারা ডিজিটাল পর্দায় বকশিশ চাওয়ার অনুরোধ বন্ধ করে দিয়েছেন এবং সরাসরি কর্মীদের বেতন বাড়িয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, মানুষের কর্মসংস্থান কেড়ে খরচ কমানোর নীতিতে তারা বিশ্বাস করেন না, তবে সেবা খাতের সংকট মেটাতে প্রযুক্তি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অপরদিকে ওয়ান ফেয়ার ওয়েজ নামের একটি গবেষণা ও অধিকার সংগঠন জানিয়েছে, মূলত কর্মীদের কম বেতন দেওয়ার সুযোগ অব্যাহত রাখতেই প্রতিষ্ঠানগুলো রোবট নামিয়ে গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত খরচের চাপ দিচ্ছে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে বকশিশের এই চর্চায় গ্রাহকদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের আতিথেয়তা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ কাতেরিনা বেরেজিনা জানান, সাধারণ অবস্থায় মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ রোবটকে বকশিশ দিতে আগ্রহী হন। কিন্তু এই অতিরিক্ত অর্থ কোনো মানব শ্রমিকের সুরক্ষায় যাচ্ছে শুনলে ৪২ শতাংশ গ্রাহক মত বদলান। তিনি মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রে রোবটের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পারিশ্রমিক সমন্বয় করতে এমন ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

তবে আচরণগত অর্থনীতিবিদরা বলছেন যন্ত্রের কাছে মানুষের কৃতজ্ঞতা দেখানোর কোনো নৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমেরিটাস মাইকেল লিন জানান, মানুষ মূলত ভালো সেবার মূল্যায়ন করতে, স্বল্প আয়ের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে কিংবা সামাজিক লজ্জা এড়াতে বকশিশ দিয়ে থাকে। রোবটের ক্ষেত্রে এই অনুভূতিগুলোর কোনো ভিত্তি নেই, ফলে যন্ত্রকে অর্থ দেওয়ারও কোনো যৌক্তিক কারণ অবশিষ্ট থাকে না। তার মতে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত মুনাফা কামাতে এই যান্ত্রিক ফাঁদ তৈরি করলেও গ্রাহকরা এটি প্রত্যাখ্যান করলে প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত এ ধরনের অন্যায্য আবদার গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।

banner
Link copied!