ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা প্ল্যাটফর্মস আবারও বড় ধরণের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান্তা ক্লারা কাউন্টি সম্প্রতি মেটার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে। এই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, মেটা জেনেশুনে প্রতারণামূলক বা ‘স্ক্যাম’ বিজ্ঞাপন থেকে মুনাফা অর্জন করছে। মেটার অভ্যন্তরীণ নথিপত্রের বরাত দিয়ে মামলায় দাবি করা হয়েছে, এই ধরণের বিজ্ঞাপন থেকে প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করে।
প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটার জন্য এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
সান্তা ক্লারা কাউন্টির পক্ষ থেকে চলতি সপ্তাহের শুরুতে দায়ের করা এই মামলায় বলা হয়েছে, মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের প্রচারকে কেবল সহজতরই করছে না, বরং এর মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে অর্থ উপার্জন করছে। গত মার্চ মাসে একটি ঐতিহাসিক রায়ে মেটার বিরুদ্ধে কিশোর-কিশোরীদের আসক্ত করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর এই নতুন মামলাটি প্রতিষ্ঠানের নীতি ও নৈতিকতাকে আবারও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে মেটার মোট আয়ের পরিমাণ ছিল ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর মধ্যেই কনজিউমার ফেডারেশন অফ আমেরিকা মেটার বিরুদ্ধে ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের পৃথক অভিযোগ এনেছে।
মামলার বিবরণে জানানো হয়েছে, মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মে আসা বিজ্ঞাপনগুলো মডারেট করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বচ্ছতা বজায় রাখছে না। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের ২০২৫ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মেটা কেবল সেইসব বিজ্ঞাপনদাতাদের নিষিদ্ধ করে যাদের জালিয়াতির বিষয়ে তারা ৯৫ শতাংশ নিশ্চিত। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে সন্দেহ এর নিচে থাকে, তাদের কাছ থেকে উল্টো বাড়তি ফি বা ‘প্রিমিয়াম’ গ্রহণ করে বিজ্ঞাপন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ জালিয়াতির জোরালো সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও মেটা তার আর্থিক মুনাফাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেটার অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং প্রোগ্রামিং টুলগুলো মূলত সমাজের ‘অসহায় গ্রাহকদের’ লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এসব প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের তালিকায় রয়েছে ভুয়া আর্থিক স্কিম, ক্রিপ্টোকারেন্সি জালিয়াতি এবং দুরারোগ্য ব্যাধি সারানোর ভুয়া ওষধি পণ্য। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে বিখ্যাত ব্যক্তিদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অনুদান বা বিনিয়োগ চাওয়া হচ্ছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, মেটার অ্যালগরিদম সরাসরি এসব প্রতারকদের ভুক্তভোগী খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
এই আইনি লড়াইয়ের ফলাফল মেটার ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক মডেলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সান্তা ক্লারা কাউন্টি মনে করছে, মেটা তার বিশাল সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞাপনের সত্যতা যাচাইয়ে উদাসীনতা দেখাচ্ছে কারণ এতে তাদের বিশাল রাজস্বের ওপর টান পড়বে। এর আগে মেটা দাবি করেছিল যে তারা জালিয়াতি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, কিন্তু বর্তমান মামলাটি সেই দাবির সত্যতাকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে মেটাকে বড় অংকের আর্থিক জরিমানা এবং নীতিগত পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গরাজ্য এবং ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোও এখন এই মামলার দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে। প্রযুক্তির এই বিশাল সাম্রাজ্যে গ্রাহক নিরাপত্তা বনাম করপোরেট মুনাফার দ্বন্দ্বটি এই মামলার মাধ্যমে নতুন করে সামনে এল।
