তুরস্ক বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতি আর নান্দনিক ল্যান্ডস্কেপের এক অনন্য দেশ। এখানে সবুজ মালভূমি, পাহাড়ের সারি কিংবা ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় গ্রামের অভাব নেই। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে জায়গাটি পর্যটকদের সম্মোহিত করে রাখে, তা হলো কাপাদোকিয়া। একে অনেকেই ‘রূপকথার দেশ’ বলে থাকেন, আর এই বিশেষণে কোনো অতিরঞ্জন নেই। এখানে বিশাল বিশাল সব পাথুরে স্তম্ভ বা ‘ফেয়ারি চিমনি’ আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আর মাটির গভীরে থাকা রহস্যময় সুড়ঙ্গগুলো হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাসের ফিসফাস শোনায়।পাথরের এই শহর এক অপূর্ব শিল্পকর্ম।
‘কাপাদোকিয়া’ নামটি এসেছে প্রাচীন পারস্য থেকে, যার অর্থ ‘সুন্দর ঘোড়ার দেশ’। এটি মূলত মধ্য আনাতোলিয়ার আকসারায়, নেভশেহির, নিগদে, কায়সেরি ও কিরশেহির—এই পাঁচটি শহরের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে অবস্থিত। লক্ষ লক্ষ বছর আগে কাছাকাছি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে এই অঞ্চলটি লাভার আস্তরণে ঢেকে গিয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় বাতাস ও পানির প্রবল আঘাতে সেই নরম পাথরগুলো অদ্ভুত সব আকার ধারণ করেছে, যা আজ আমাদের মুগ্ধ করে।মাটির নিচের রহস্যময় শহর
কাপাদোকিয়া কেবল প্রকৃতির দান নয়, এখানে মানুষের হাতের ছোঁয়াও মিশে আছে। প্রাচীন বাসিন্দারা আগ্নেয়গিরির নরম পাথরের ভেতরে অবিশ্বাস্য সব সুড়ঙ্গ ও কক্ষ তৈরি করেছিলেন। তারা তৈরি করেছিলেন গুহা, বসবাসের ঘর, উপাসনালয়, এমনকি আস্তাবলও। এখানকার মাটির নিচে এমন কিছু সুড়ঙ্গ ও জটিল কাঠামো রয়েছে যা আটতলা পর্যন্ত মাটির গভীরে বিস্তৃত। কাপাদোকিয়ায় বর্তমানে ৩০টিরও বেশি ভূগর্ভস্থ শহর আবিষ্কৃত হয়েছে, যা একসময় হাজার হাজার মানুষের নিরাপদ আশ্রয় ছিল।দেখার মতো সেরা জায়গাগুলো
আজ কাপাদোকিয়া একটি বিশাল উন্মুক্ত জাদুঘর। এখানকার উচিসার, গোরেমে, আভানোস, উরগুপ, দেরিনকুয়ু ও ইহলারা উপত্যকা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। উচিসারের পাথুরে কেল্লা থেকে পুরো অঞ্চলটির অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। এখান থেকে কিছু দূরেই রয়েছে গোরেমে ওপেন-এয়ার মিউজিয়াম, যা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। পাথরের গুহায় খোদাই করা গির্জা আর দ্বাদশ শতকের উজ্জ্বল সব ম্যুরাল ও ফ্রেস্কো দেখলে মনে হবে ইতিহাসের পাতায় ফিরে গেছেন।
আভানোস শহরটি তার লাল মাটির জন্য বিখ্যাত। হিট্টাইট আমল থেকেই এখানে মৃৎশিল্পের চর্চা হয়ে আসছে। আপনি চাইলে মৃৎশিল্পীদের কাজ দেখে নিতে পারেন, এমনকি তাদের সাহায্য নিয়ে নিজের হাতেও কিছু তৈরি করতে পারেন। উরগুপ শহরটি আবার বিলাসবহুল বুটিক হোটেলের জন্য পরিচিত। আর যারা রোমাঞ্চ খুঁজছেন, তারা অবশ্যই দেরিনকুয়ু ও কায়মাকলির ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলোতে ঘুরে আসবেন। সবশেষে, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা ইহলারা উপত্যকা আপনার ট্রেকিং ও প্রকৃতি ভ্রমণের তৃষ্ণা মেটাবে।
কাপাদোকিয়া ভ্রমণ মানেই যেন রূপকথার পাতায় হারিয়ে যাওয়া। প্রাচীন এই স্থাপত্য আর প্রকৃতির অদ্ভুত সব কারুকাজ একে পর্যটকদের কাছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা গন্তব্যে পরিণত করেছে। যারা ইতিহাস ও রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাদের জীবনের অন্তত একবার হলেও এই পাথরের দেশে আসা উচিত।
