বুধবার, ০৫ আগস্ট, ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩

এআই প্রতারণা রুখতে পরিবারের জন্য গোপন পাসওয়ার্ড

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৫, ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম

এআই প্রতারণা রুখতে পরিবারের জন্য গোপন পাসওয়ার্ড

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ডিপফেক ভয়েস স্ক্যাম বিশ্বজুড়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এই ধরনের অভিনব প্রতারণা থেকে বাঁচতে পরিবারগুলোকে নিজেদের মধ্যে একটি গোপন কোড বা পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা, বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। অপরাধীরা এখন অত্যন্ত নিখুঁত প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করছে এবং ভুয়া বিপদের গল্প সাজিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাফেলো শহরের বাসিন্দা এলিজাবেথ বেঞ্জ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এমন একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হন। তিনি একটি ফোন কল পান, যেখানে অপর প্রান্তের কণ্ঠস্বরটি হুবহু তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে জনের মতো শোনাচ্ছিল। এরপর এক অপরিচিত ব্যক্তি ফোনটি নিয়ে দাবি করে যে, সে জনের এক বন্ধুকে হত্যা করেছে এবং সাড়ে সাত হাজার মার্কিন ডলার মুক্তিপণ না দিলে জনকেও হত্যা করা হবে। আতঙ্কিত হয়ে এলিজাবেথ টাকা নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তার আরেক ছেলে জনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয় এবং জানতে পারে যে জন সম্পূর্ণ নিরাপদে একটি ফুটবল খেলায় আছে। পুরো ঘটনাটি ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সাজানো একটি প্রতারণা।

অনলাইন প্রতারণার কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বর্তমানে কল্পনাতীত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিবিসি নিউজের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই মানুষ প্রায় ১৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হারিয়েছে। এর মধ্যে ৬ বিলিয়নের বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর স্ক্যামের কারণে। ডিপফেক বিষয়ক অন্যতম শীর্ষ বিশেষজ্ঞ এবং গেটரியেল সিকিউরিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হানি ফরিদ সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, বিশ্বজুড়ে এই ধরনের প্রতারণা ব্যাপক হারে বাড়ছে। সাধারণ মানুষ হঠাৎ গভীর রাতে বিপদের কথা শুনে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না, আর অপরাধীরা এই দুর্বলতার সুযোগ নেয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অডিও ক্লিপ ব্যবহার করেই অপরাধীরা যে কারও কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করতে পারে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেই কণ্ঠের আবেগ এবং ওঠানামাও নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। যখন একজন মা বা বাবা তার সন্তানের বিপদের কথা এমন পরিচিত কণ্ঠে শোনেন, তখন তাদের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি লোপ পায়। এ কারণেই প্রযুক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি মানসিক প্রস্তুতির ওপরও জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি পরিবারকে একটি গোপন পাসওয়ার্ড তৈরি করার পরামর্শ দিচ্ছেন। এই কোডটি এমন হওয়া উচিত যা পরিবারের সদস্যদের মনে রাখা সহজ, কিন্তু বাইরের কারও পক্ষে অনুমান করা অসম্ভব। যদি পরিবারের কোনো সদস্য হঠাৎ ফোন করে দুর্ঘটনায় পড়ার কথা বলে বা জরুরিভিত্তিতে টাকা পাঠাতে বলে, তবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সেই গোপন কোডটি জানতে চাইতে হবে। এলিজাবেথ জানান, তাদের পরিবারের একটি গোপন কোড থাকা সত্ত্বেও চরম আতঙ্কের কারণে তিনি সেটি ব্যবহার করার কথা ভুলে গিয়েছিলেন।

প্রতারকদের মূল লক্ষ্য থাকে শিকারকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং ভীত করে তোলা। আইনজীবী গ্যারি চাইল্ডহর্ন, যিনি নিজেও এমন প্রতারণার হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন, তিনি এ ধরনের কলের তিনটি প্রধান লক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, প্রতারকরা সবসময় একটি কৃত্রিম তাগিদ তৈরি করে যাতে মানুষ চিন্তা করার সময় না পায়। দ্বিতীয়ত, তারা ক্রিপ্টোকারেন্সি বা গিফট কার্ডের মতো মাধ্যমগুলোতে টাকা দাবি করে, যা সহজে ট্র্যাক করা যায় না। তৃতীয়ত, তারা শিকারকে ফোনে ব্যস্ত রেখে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে।

আতঙ্কিত হয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে যেকোনো তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করার বিষয়ে পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সূরা আল-হুজুরাত (৪৯:৬) এ বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো খবর নিয়ে আসে, তবে তা ভালোভাবে যাচাই করে নিতে হবে। এই শাশ্বত নির্দেশনাটি বর্তমান সময়ের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিপদ যতই ভয়াবহ মনে হোক না কেন, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে সত্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

banner
Link copied!