ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের কাছে আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৯২০ জনে দাঁড়িয়েছে এবং তিন হাজারেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিবিসি নিউজ এবং মার্কিন স্প্যানিশ ভাষার সংবাদমাধ্যম ইউনিভিশন নিশ্চিত করেছে। গত বুধবারের এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো ধসে পড়া ঘরবাড়ির কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকা জীবিতদের সন্ধানে দিনরাত ব্যাপক অনুসন্ধান তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই চরম মানবিক সংকটের মধ্যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বেশ কিছু মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক প্রাণহানির ঘটনা সামনে এনেছে যা সমগ্র লাতিন আমেরিকার এই দেশটিকে গভীর শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে।
ধসে পড়া একটি বহুতল আবাসিক ভবনের নিচে নিজের অবুঝ শিশু কন্যাকে বাঁচাতে গিয়ে আন্দ্রেয়া নামের এক ভেনেজুয়েলীয় মা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন বলে স্থানীয় ক্রীড়া ও সামাজিক সংস্থা কুমানা দে কাম্পিওনেস নিশ্চিত করেছে। আন্দ্রেয়া ছিলেন দেশটির পেশাদার ফুটবলার এক্তর বেইয়ো ওরফে কিকের স্ত্রী এবং ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে তাদের পুরো পরিবার যে বহুতল ভবনে বসবাস করত সেটি মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে। ধসে পড়ার চরম মুহূর্তে আন্দ্রেয়া নিজের শরীর দিয়ে শিশু কন্যাকে আগলে রাখেন যার ফলে ভবনটি ভেঙে পড়লেও শিশুটি অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় কিন্তু মা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মৃত মায়ের নিথর দেহের নিচ থেকে জীবিত অবস্থায় শিশুটিকে এবং তার খালাকে উদ্ধার করে বর্তমানে কারাকাসের একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেছেন যেখানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতাল থেকে ফুটবলার এক্তর বেইয়ো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তায় জানান যে তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে গভীরভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং অবুঝ মেয়েকে একা একা বড় করার জন্য এখন ঈশ্বরের কাছে মানসিক শক্তি প্রার্থনা করছেন।
ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা এই জোড়া ভূমিকম্পে দেশটির ক্রীড়াঙ্গনেও অত্যন্ত মারাত্মক আঘাত এসেছে এবং দেশের দুজন অত্যন্ত উদীয়মান ফুটবল খেলোয়াড়ের করুণ মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে ভেনেজুয়েলীয় ফুটবল ফেডারেশন। কারাকাস ফুটবল ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১৮ দলের প্রতিভাবান খেলোয়াড় রাজান সিজা সমুদ্র উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চলে অবস্থিত তার নিজ বাড়িতে পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যসহ ধসে পড়া ছাদের নিচে চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন। ফুটবল ক্লাব কর্তৃপক্ষ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তরুণ এই খেলোয়াড়ের অকাল প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছে যে তার খেলার প্রতি উৎসর্গ ও বন্ধুত্ব ক্লাবের প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে আজীবন অম্লান থাকবে। অন্যদিকে ক্লাব স্পোর্ট সান আগস্তিন একাডেমির মারিতিমো দে লা গুয়াইরা দলের আরেকজন প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় ভিক্তর পালাসিওস এই একই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন বলে ক্লাব প্রশাসন দুঃখের সাথে নিশ্চিত করেছে।
এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন দেশটির বিনোদন জগতের বহু পরিবারের সদস্যরা যার মধ্যে সাবেক মিস ভেনেজুয়েলা জিসেল রেয়েসের মা-ও লা গুয়াইরা অঞ্চলে নিজের বহুতল ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ার কারণে মারা গেছেন। জিসেল রেয়েস পরবর্তীতে নিশ্চিত করেছেন যে তার মা মূলত ভবনের ধসে পড়ার তীব্র শব্দ এবং প্রচণ্ড ঝাঁকুনির আকস্মিক আঘাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওই বিধ্বস্ত বাড়ি থেকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার হওয়া একজন ব্যক্তিগত সেবিকা বা নার্স পরবর্তীতে এই মৃত্যুর খবরটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেন যিনি বিপর্যয়ের সময় তার মায়ের পাশেই ছিলেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই ব্যাপক পাহাড়ি ধস ও নগর ধ্বংসযজ্ঞের পর নিখোঁজ থাকা শত শত মানুষের সন্ধান কবে নাগাদ মিলবে এবং দেশটির ভেঙে পড়া চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থাকে পুনরায় কীভাবে সচল করা সম্ভব হবে কারণ দুর্যোগের পর থেকে এখনো বহু মানুষ খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন।
