পবিত্র মক্কা নগরীর মসজিদুল হারামের আধ্যাত্মিক পরিবেশ সবসময়ই মুমিন হৃদয়ে এক প্রশান্তি বিলিয়ে দেয়। লাখো মানুষের ভিড়ে এখানে প্রতিনিয়ত কত শত আরজি মহান আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় তার ইয়ত্তা নেই। সম্প্রতি এমনই এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের হৃদয়ে নতুন করে আশার আলো জুগিয়েছে। ঘটনাটি মক্কার হারামে কর্মরত একজন পাকিস্তানি পরিচ্ছন্নতা কর্মীর। সাদা-মাটা জীবন যাপন করা এই ব্যক্তিটি অভাব ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি তার দায়িত্ব পালন শেষে ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে কাবা শরীফের সামনে অত্যন্ত বিনয় ও একাগ্রতার সাথে মহান রবের কাছে নিজের মনের আকুতি জানাচ্ছিলেন। অভাব-অনটন থেকে মুক্তির জন্য তার সেই চোখের জল আর দুই হাত তুলে কাঁদার দৃশ্যটি হঠাৎ করেই হারাম শরীফের লাইভ ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই দৃশ্যটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখো মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটে।
আল্লাহর কুদরত বোঝা বড়ই কঠিন। সেই দৃশ্যটি সৌদি আরবের একজন অত্যন্ত দয়ালু ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নজরে আসে। তিনি ভিডিওটি দেখার পর সেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং তাকে খুঁজে বের করেন। সেই দানবীর ব্যক্তিটি কেবল তাকে সান্ত্বনাই দেননি, বরং তার সমস্ত ঋণের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং তার আর্থিক সচ্ছলতার ব্যবস্থা করে দেন। পরবর্তীতে সেই কর্মীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, তিনি সেই মুহূর্তে ঠিক কোন দোয়াটি পড়ছিলেন যা এত দ্রুত কবুল হলো। তিনি অত্যন্ত সরলতার সাথে জানিয়েছিলেন যে, তিনি অভাব মুক্তির সেই দোয়াটি পড়ছিলেন যা স্বয়ং বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করতেন। মূলত এটি কেবল একটি দোয়া নয়, বরং কঠিন সংকটে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন থেকে প্রাপ্ত এই দোয়ার একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট রয়েছে। একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে একজন মেহমান এলেন। তিনি অত্যন্ত মেহমানদার ছিলেন, কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর ঘরে মেহমানকে খাওয়ানোর মতো কিছুই ছিল না। তিনি একে একে তাঁর সকল পবিত্র স্ত্রীদের ঘরে লোক পাঠালেন কিন্তু সব জায়গা থেকেই খবর এল যে আজ ঘরে খাবারের কিছুই নেই। এমন এক কঠিন ও সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিচলিত না হয়ে মহান আল্লাহর কাছে একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করলেন। দোয়াটি ছিল এমন—
”اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ وَرَحْمَتِكَ، فَإِنَّهُ لَا يَمْلِكُهَا إِلَّا أَنْتَ“ বাংলায় আরবি উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা মিন ফাদলিকা ওয়া রাহমাতিকা, ফাইন্নাহু লা ইয়ামলিকুহা ইল্লা আন্তা। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আপনার অনুগ্রহ ও রহমত প্রার্থনা করছি। কেননা, আপনি ছাড়া আর কেউ এর মালিক নয়।
(আত-তাবারানি, আল-মুজামুল কাবীর: ১০৩৭৯)
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দোয়াটি পাঠ করার পর অলৌকিকভাবে এক ব্যক্তি তাঁর কাছে একটি ভাজা বকরি উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, এটি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই ফজল বা অনুগ্রহ যা তিনি এই দোয়ার উসিলায় দান করেছেন। ইসলামি স্কলারদের মতে, এই দোয়াটি অভাব, অনটন ও চরম দারিদ্র্যের সময় পাঠ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। যারা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছেন কিংবা জীবনযুদ্ধে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য এই সুন্নতি আমলটি হতে পারে মুক্তির সোপান। মক্কার সেই পরিচ্ছন্নতা কর্মীর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ তায়ালা বান্দার খুব কাছেই থাকেন এবং তিনি আন্তরিক প্রার্থনা কখনো ফিরিয়ে দেন না।
যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে মানুষের কাছে হাত না পেতে বরং স্রষ্টার কাছে সাহায্য চাওয়াই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তাতে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে আল্লাহ তায়ালার শেখানো পদ্ধতি ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা জরুরি। হারামের সেই কর্মী আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেলেন যে, আল্লাহর কাছে চাওয়ার মতো চাইতে পারলে আকাশ থেকেও রিজিকের ব্যবস্থা হতে পারে। ইসলামে দোয়াকে ইবাদতের মগজ বলা হয়েছে। সুতরাং প্রতিটি পদক্ষেপে বিশেষ করে যখন রিজিকের সংকট দেখা দেয়, তখন এই ছোট কিন্তু শক্তিশালী দোয়াটি নিয়মিত পাঠ করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে অভাব ও ঋণমুক্ত একটি সুন্দর জীবন দান করুন এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন।

আপনার মতামত লিখুন :