এক অত্যন্ত দরিদ্র ও অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরানের একজন ব্যক্তিত্ব, যাকে কেন্দ্র করে আজ বিশ্ব রাজনীতির অনেক সমীকরণ আবর্তিত হয়। তাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন করার জন্য এক সময় খোদ রাষ্ট্রের সংবিধান পর্যন্ত সংশোধন করতে হয়েছিল। তিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ও ক্ষমতাধর নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতারা যখন ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছিলেন তখন খামেনি তার মতাদর্শ ও নেতৃত্বের মাধ্যমে এক অনড় অবস্থানে থেকে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। শিয়া সম্প্রদায়ের মাঝে তাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গণ্য করা হলেও সুন্নিসহ অনেক মুসলিম ও অমুসলিম দেশের সাধারণ মানুষের কাছেও তার বিভিন্ন সাহসী পদক্ষেপ নিরব সমর্থন পেয়ে আসছে। তার এই প্রভাব কেবল রাজনৈতিক কূটনীতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই বরং তার ব্যক্তিগত জীবন যাপন এবং নির্ভীক বাচনভঙ্গি তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ইসলামিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই রোমাঞ্চকর বিবর্তন বুঝতে হলে আমাদের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের প্রধান রূপকার আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং তার সুযোগ্য উত্তরসূরি আলী খামেনির জীবনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আলী খামেনির পূর্ণ নাম সাইয়্যেদ আলী হোসেইনি খামেনি। শিয়া ধর্মীয় পরিভাষায় আয়াতুল্লাহ শব্দটির অর্থ হলো আল্লাহর নিদর্শন যা কেবল উচ্চতর জ্ঞানসম্পন্ন প্রবীণ পণ্ডিতদের প্রদান করা হয়।
বংশীয় লতিকা অনুযায়ী অনেক ঐতিহাসিক দাবি করেন যে তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ৩৮তম বংশধর। তার এই বংশ পরিচয়ের কারণে তিনি সাইয়্যেদ খেতাব পান এবং সম্মানের প্রতীক হিসেবে সর্বদা কালো পাগড়ি পরিধান করেন যা তাকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে বিশেষ মর্যাদা দান করেছে। ১৯৩৯ সালে ইরানের মাশহাদের এক দরিদ্র পণ্ডিত পরিবারে জন্মগ্রহণকারী খামেনি শৈশব থেকেই ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি প্রবল অনুরাগী ছিলেন।
আলী খামেনি কেবল প্রথাগত ধর্মীয় শিক্ষায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং পশ্চিমা সাহিত্য ও মিসরীয় বিপ্লবী চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ কুতুবের দর্শনের মাধ্যমেও গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ভিক্টর হুগো এবং জন স্টেইনব্যাকের মতো লেখকদের অমর সৃষ্টিগুলো যেমন তিনি অধ্যয়ন করেছেন তেমনি সাইয়্যেদ কুতুবের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই তিনি ফারসি ভাষায় অনুবাদও করেছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি যখন খোমেনির তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করছিলেন তখন ইরানের তৎকালীন শাসক রেজা শাহ পাহলভির পশ্চিমা আদলে আধুনিকায়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।
শাহের শ্বেত বিপ্লবের নামে ইসলামি মূল্যবোধ বিরোধী সংস্কারের বিরুদ্ধে খোমেনির ডাকে সাড়া দিয়ে তরুণ খামেনি আন্দোলনের সামনের সারিতে চলে আসেন এবং বহুবার কারাবরণ করেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় তিনি তেমন বড় কোনো পদে না থাকলেও তার অনলবর্ষী বক্তৃতা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৮০ সালের দিকে তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর খামেনির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বাগ্মিতা নতুন মাত্রা পায়। তার খুতবা শোনার জন্য প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। মাজিয়ার বাহারির মতো সমালোচক সাংবাদিকও তার বিনয়ী এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং এর অল্প সময় পরই এক ভয়াবহ বোমা হামলায় তার ডান হাতটি চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয় ক্ষুধা এবং জান মাল ও ফল-ফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)। এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার জনপ্রিয়তাকে না কমিয়ে বরং মানুষের মনে আরও বেশি সহানুভূতি ও শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করে দেয়।
১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির ইন্তেকালের পর রাজনৈতিক ও সামরিক বাহিনীর সাথে সুগভীর সম্পর্কের কারণে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার দীর্ঘ শাসনামলে তিনি কুদস ফোর্সের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং সামরিক প্রযুক্তিতে দেশকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে আপসহীন ভূমিকা পালন করেন। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তার অনড় অবস্থান এবং ফিলিস্তিন ইস্যুকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান তাকে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অর্থনৈতিকভাবেও তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন যা রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তার করে আছে। যদিও তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিরোধীদের দমনের অভিযোগ রয়েছে তবুও তিনি তার আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার এই রাজত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে যেমনটি পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে বলুন হে আল্লাহ রাজত্বের মালিক! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন (সূরা আল-ইমরান, ৩:২৬)। আলী খামেনির এই উত্থান ও রাজত্ব বিশ্ব রাজনীতির এক অবিশ্বাস্য অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

আপনার মতামত লিখুন :