শনিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২

জ্বালানি যুদ্ধের মুখে বিশ্ব: কেন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে হরমুজ প্রণালী?

উম্মাহ কণ্ঠ মার্চ ৬, ২০২৬, ১২:১০ পিএম
জ্বালানি যুদ্ধের মুখে বিশ্ব: কেন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে হরমুজ প্রণালী?

হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব ও সংঘাত | ছবি Ai

হরমুজ প্রণালী দিয়ে আর কোনো পণ্যবাহী জাহাজকে শান্তিতে যাতায়াত করতে দেওয়া হবে না এমন এক ভয়ংকর হুঁশিয়ারি আজ গোটা বিশ্বকে এক অকল্পনীয় আতঙ্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার এই উত্তাল জলরাশিতে এখন বারুদের গন্ধ এবং যুদ্ধের ঘনঘটা যা যেকোনো মুহূর্তে পৃথিবীর অর্থনীতির চাকা থামিয়ে দিতে পারে। বর্তমান সময়ের এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি মূলত আরও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে আমেরিকা এবং ইসরায়েলের এক যৌথ হামলার পর যেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণকে তেলের বাজারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইরানের প্রধান অস্ত্র এখন এই হরমুজ প্রণালী। ইতিমধ্যে প্রণালীর বুকে ভাসমান একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনা এবং বিস্ফোরণের শব্দ প্রমাণ করে যে এই যুদ্ধের প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং এটি গোটা পৃথিবীর উপর এক ধ্বংসাত্মক ছায়া ফেলেছে। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর জ্বালানির উপর চাপ প্রয়োগ করে এই যুদ্ধকে নিজেদের কবজায় আনার এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তেহরান।

ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে হরমুজ প্রণালী হলো একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ জলপথ যার প্রশস্ততা কোথাও কোথাও মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। এই প্রণালীর একপাশে ইরান এবং অন্যপাশে ওমান অবস্থান করছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই চলমান সংঘাত যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে এই প্রণালীটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় তবে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজার কতটা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে তা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। উপসাগরীয় এলাকার যাবতীয় তৈলবাহী জাহাজ এই একটি মাত্র সরু খাঁড়ি হয়েই বাকি বিশ্বের কাছে পৌঁছায়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে মহান আল্লাহ তায়ালা এই পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে সমুদ্রপথগুলোকে মানুষের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, "তোমাদের রব তো তিনিই, যিনি সাগরে তোমাদের জন্য নৌযানসমূহ পরিচালিত করেন, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পারো। নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু" (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৬৬)। আল্লাহর এই অপার নিয়ামতের এক অনন্য নিদর্শন হলো এই হরমুজ প্রণালী যা যুগ যুগ ধরে মানুষের রিজিক ও বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু মানুষের সীমাহীন লোভ আজ সেই শান্তির জলপথকে যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করেছে।

দুনিয়ার চাকা সচল রাখতে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয় তার প্রায় ২০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক তরলীকৃত গ্যাস বা এলএনজি-এর প্রায় ৩০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই সরবরাহ করা হয়। এটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান লাইফলাইন। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক এবং ইরান তাদের অপরিশোধিত তেল এই পথেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রেরণ করে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার এই হুমকি ইরানের জন্য নতুন কিছু নয় বরং এটি তাদের এক পুরোনো ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার। তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা কারণ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের তেলের খনিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সম্পদের প্রতি মানুষের এই অন্ধ মোহ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে সতর্ক করা হয়েছে যেখানে আল্লাহ বলেন, "প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে পৌঁছাও" (সূরা আত-তাকাসুর, ১০২:১-২)।

যদি সত্যিই হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায় তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম রকেটের গতিতে বৃদ্ধি পাবে যা সরাসরি প্রতিটি দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তেহরান বর্তমানে এক বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে যেখানে তারা পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন দূতাবাসগুলোতে হামলার মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিয়ে বাকি বিশ্বের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করাই তাদের মূল লক্ষ্য। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে এই প্রণালীর গুরুত্ব কেবল আজকের নয় বরং যিশু খ্রিস্টের জন্মের হাজার বছর আগে থেকেই মেসোপটেমীয় সভ্যতায় এই জলপথের ব্যবহার ছিল। প্রাচীন গ্রিক গ্রন্থ পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিথ্রিয়ান সি-তেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী ছাড়া তেল বাণিজ্যের এক ইঞ্চি নড়াচড়া প্রায় অসম্ভব। ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ এবং কাতারের রাস লাফান বন্দর—সবই এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।

মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল এই পথ দিয়ে রপ্তানি হয় যার বড় অংশ যায় এশিয়ার বাজারে। মানুষের এই সম্পদ বণ্টনের ওপর আল্লাহর সুনিপুণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং আমাদের সর্বদা তাঁর কাছেই জবাবদিহিতার অনুভূতি রাখা উচিত। সহীহ হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "দুনিয়া হলো মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত" (সহীহ মুসলিম, ২৯৫৬)। দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার মোহে পরাশক্তিগুলো আজ যে ধ্বংসলীলায় মেতেছে তা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্যই এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। বিশেষ করে ভারতের মতো দেশের জন্য এটি এক অশনিসংকেত কারণ ভারতের তেলের অন্তত ৮৫ শতাংশ এই পথেই আসে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লির নীরবতা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি বাঁচাতে তাদের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এই সংঘাতের চরম মূল্য এখন গোটা বিশ্বকে দিতে হচ্ছে এবং চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল এক আল্লাহর হাতেই নিবদ্ধ তা ভুলে যাওয়ার অবকাশ নেই।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!