বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩

ভারতের বাজারে তীব্র চিনি সংকট ও এক দশকে প্রথম আমদানি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ২৬, ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম

ভারতের বাজারে তীব্র চিনি সংকট ও এক দশকে প্রথম আমদানি

বিশ্বের বৃহত্তম চিনি ভোক্তা দেশ ভারত গত দুই মাসে চিনির দাম প্রায় চল্লিশ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর এক মিলিয়ন টন চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবর থেকে আগামী বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলমান মৌসুমে দেশটির মোট চিনি উৎপাদন ৩০ দশমিক ছিয়ানব্বই মিলিয়ন টনে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা সরকারের আগের প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় প্রায় এগারো শতাংশ কম। দেশজুড়ে গণেশ চতুর্থী, দশেরা ও দীপাবলির মতো বড় উৎসব এবং আসন্ন বিয়ের মৌসুম সামনে রেখে বাজারে চিনির চাহিদা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পাইকারি বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। মে ও জুন মাসে প্রতি কেজি চিনি চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ রুপিতে বিক্রি হলেও আগস্ট মাসে তা বেড়ে আটান্ন থেকে ষাট রুপিতে পৌঁছায়।

এল নিনোর প্রভাবে অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, ফসলে রোগবালাই এবং কৃষকদের উৎপাদনে ঘাটতির কারণে সরকার এই সংকটের মুখে পড়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে কৃষি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন হ্রাসের প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করেই চলতি মৌসুমের শুরুতে সরকার প্রায় পনেরো লাখ টন চিনি রপ্তানির অনুমতি দেওয়ায় সংকটের মাত্রা আরও তীব্র হয়েছে। পরবর্তীতে গত মে মাসে রপ্তানি স্থগিত করার আগে প্রায় আট লাখ টন চিনি দেশ থেকে বাইরে চলে যায়, যার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে মজুত বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে আসে। এছাড়া উৎপাদিত আখের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইথানল উৎপাদনে সরিয়ে নেওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় চিনি মিল অ্যাসোসিয়েশন মিলগুলোকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে পনেরো দিন আগেই আখ মাড়াই শুরুর নির্দেশ দিয়েছে যাতে নতুন ফসল বাজারে আসার আগেই মজুত শক্তিশালী করা যায়। বন্দরগুলোর কাছাকাছি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত শোধনাগারগুলোকে আগামী পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে তিন মাসের জন্য শুল্কমুক্তভাবে অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনি বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এক দশক আগে তীব্র খরার সময় সর্বশেষ অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য ভারত এভাবে চিনি আমদানি করেছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করে তোলে। সরকারের পক্ষ থেকে মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য মজুতের সর্বোচ্চ সীমা চারশ টনে নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে বৈশ্বিক পর্যায়েও থাইল্যান্ড ও ব্রাজিলের মতো প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় এবং ইউরোপে তাপপ্রবাহের কারণে চিনির বৈশ্বিক সরবরাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি মৌসুমে বিশ্বব্যাপী মোট চিনি উৎপাদন হ্রাস পেয়ে একশ চুরাশি দশমিক নয় মিলিয়ন টনে দাঁড়াতে পারে। লন্ডনে পরিশোধিত চিনির ফিউচার মূল্য এবং নিউ ইয়র্কেও কাঁচা চিনির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভারতের এই আমদানির সিদ্ধান্তের ওপর আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব স্পষ্ট করে।

তবে বর্তমান চড়া দামের কারণে মিলগুলো যদি আখ থেকে ইথানল উৎপাদন কমিয়ে সরাসরি চিনি উৎপাদনে মনোযোগ দেয়, তবে আগামী দিনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন। এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনের সঠিক প্রাক্কলন ও পরিকল্পনা প্রণয়নে আরও বেশি সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিত্যপণ্য রাখতে নানামুখী উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছেন।

banner
Link copied!