আসছে বছরগুলোতে এশিয়া জুড়েই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ। গত বৃহস্পতিবার ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বার্ষিক বৈঠকে এই বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাটি এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
ইরান সংশ্লিষ্ট যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি ধাক্কাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের প্রবৃদ্ধিতে সম্ভাব্য সংশোধন এবং বৈশ্বিক বন্ডের মুনাফা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় এশিয়ার আর্থিক বাজারগুলোতে অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে। চলতি বছরের শুরুর দিকে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার পর থেকেই বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং মূলধন প্রবাহে বেশি অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এর ফলে অঞ্চলের বেশ কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রার মান অবমূল্যায়নের চাপের মুখে পড়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী থাকলেও এর পাশাপাশি পোর্টফোলিও থেকে পুঁজি প্রত্যাহারের প্রবণতাও দেখা গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের মতো কিছু নির্দিষ্ট খাত থেকে পুঁজি তুলে নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের শেষের দিকে মার্কিন মুদ্রানীতি আরও কঠোর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রধান উন্নত অর্থনীতিগুলোর আর্থিক চাপের সঙ্গে এই কঠোর মুদ্রানীতি যুক্ত হলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বন্ডের মুনাফা বাড়ার চাপ অব্যাহত থাকবে। আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৃহত্তর এশিয়ার অর্থনীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে।
এপ্রিল মাসের প্রাক্কলনের তুলনায় এই সংখ্যাগুলো কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও তা ২০২৫ সালের ৫ দশমিক শূন্য শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় মন্থর গতির ইঙ্গিত দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের উত্থান থেকে বাড়তি সুবিধা পাবে এশিয়ার উন্নত অর্থনীতিগুলো।
গত বছরের ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। উদীয়মান এশিয়া অঞ্চলের অর্থনীতিই মূলত আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
তবে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে এই বাজারগুলোর প্রবৃদ্ধি গত বছরের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৫ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে নিম্নমুখী ঝুঁকির শঙ্কাটাই বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পণ্যের দাম চড়া থাকতে পারে এবং তেলের মজুদ ফুরিয়ে যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পণ্যের চাহিদা হঠাৎ কমে গেলে তা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উৎপাদন শৃঙ্খলের সঙ্গে এশিয়া গভীরভাবে যুক্ত থাকায় এর পরিণতি এই অঞ্চলে বেশ জোরালোভাবেই অনুভূত হবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোজোন এবং জাপানের মতো প্রধান সার্বভৌম ঋণদাতা দেশগুলোর বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে তা এশিয়ার বন্ড বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতির কারণে বন্ডের মুনাফা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে তুলবে। এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশেই সরকারি ঋণ এবং ঋণের চাহিদা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
আর্থিক অবস্থার আকস্মিক কড়াকড়ি দেখা দিলে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে গিয়ে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর নজর অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ অঞ্চলের দেশগুলোর উচিত কার্যকর এবং সুনির্দিষ্ট আর্থিক নীতি অনুসরণ করা।
অপ্রয়োজনীয় এবং ব্যয়বহুল প্রমাণিত হতে পারে এমন সাধারণ জ্বালানি ভর্তুকি বা মূল্য নিয়ন্ত্রণ নীতি থেকে বিরত থাকা উচিত দেশগুলোর।
