ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা শুরু হওয়ায় ইউরোপে বিমান ভাড়ার দাম বাড়া এখন অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) প্রধান উইলি ওয়ালশ সম্প্রতি এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি জানান যে জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্যের কারণে বিমান সংস্থাগুলোর পক্ষে এই বাড়তি খরচ দীর্ঘদিন সামলানো সম্ভব নয়। ফলে যাত্রীদের এখন থেকে টিকিটের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ গুণতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালীর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় এই অঞ্চলটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক সংঘাত থেকে। এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেট ফুয়েলের দাম ও সরবরাহের ওপর। ইউরোপীয় দেশগুলো সাধারণত তাদের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ এই অঞ্চল থেকে আমদানির মাধ্যমে মেটায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎসের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠেছে দেশগুলো। আইএটিএ প্রধান জানিয়েছেন যে আগামী গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে অর্থাৎ জুলাই ও আগস্ট মাসে যুক্তরাজ্যের বিমান খাত বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে পারে। তবে তিনি এখনই আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের কিছু অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান ভাড়া কমতে দেখা গেছে। বিমান সংস্থাগুলো মূলত চাহিদার অভাব কাটাতে এবং পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে টিকিটে ছাড় দিচ্ছে। তবে উইলি ওয়ালশ মনে করেন এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি মাত্র। তাঁর মতে দীর্ঘ মেয়াদে তেলের চড়া দামের প্রভাব টিকিটের ওপর পড়বেই এবং বিমান সংস্থাগুলো এই লোকসান নিজে বহন করবে না। ইতিমধ্যে দূরপাল্লার বা লং-হল ফ্লাইটের টিকিটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করেছে। যা আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। গত সপ্তাহে ইইউ জানিয়েছে যে ইউরোপীয় বিমান সংস্থাগুলো চাইলে এখন থেকে মার্কিন গ্রেডের জেট ফুয়েল ব্যবহার করতে পারবে। এর আগে ইউরোপে এই জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু আইনি ও কারিগরি বিধিনিষেধ ছিল। ইইউ-র জ্বালানি কমিশনার ড্যান জর্গেনসেন জানিয়েছেন যে স্বল্প মেয়াদে বড় কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই তবে দীর্ঘ মেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই সুর শোনা গেছে ট্রাভেল অপারেটর টিইউআই-এর প্রধান নির্বাহী সেবাস্টিয়েন ইবেলের কণ্ঠেও।
যুক্তরাজ্য সরকার অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি করছে। সরকারি একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে ব্রিটিশ বিমান সংস্থাগুলোর কাছে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে এবং তারা কোনো তাৎক্ষণিক সংকটের খবর দেয়নি। গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় যাত্রীদের যেন কোনো বিপাকে পড়তে না হয় সে লক্ষ্যে এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে কাজ করছে সরকার। তবে আইএটিএ প্রধানের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। সাধারণত মার্চ মাসের তুলনায় জুলাই ও আগস্ট মাসে ফ্লাইটের সংখ্যা ও জ্বালানির চাহিদা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এই বাড়তি চাহিদা মেটানোর মতো বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা যদি দ্রুত নিশ্চিত না করা যায় তবে ফ্লাইটের শিডিউল বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যায়।
সবশেষে বলা যায় যে হরমুজ প্রণালী যদি আগামীকালও খুলে দেওয়া হয় তবুও বিশ্ববাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল তেলের দামই বাড়ায়নি বরং পরিশোধনাগার ও সরবরাহ অবকাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে জ্বালানির দাম খুব দ্রুত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। উইলি ওয়ালশের মতে এই অস্থিরতা আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত চলতে পারে। এর অর্থ হলো কেবল এই গ্রীষ্মেই নয় বরং আগামী শীতকালীন ভ্রমণেও পর্যটকদের পকেটে টান পড়তে পারে। বিশ্ব রাজনীতির এই জটিল সমীকরণ এখন সরাসরি সাধারণ মানুষের ভ্রমণের বাজেটে আঘাত হানছে।
