বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩

কিউবায় জ্বালানি সংকট: সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গেছে ডিজেল ও তেল

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৪, ২০২৬, ০১:১৪ পিএম

কিউবায় জ্বালানি সংকট: সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গেছে ডিজেল ও তেল

তীব্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া কিউবায় এবার জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। দেশটির জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ভিসেন্তে দে লা ও লেভি এক সরকারি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, কিউবায় ডিজেল এবং ক্রুড বা ফার্নেস অয়েলের মজুদ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে কেবল নিজস্ব কূপ থেকে উত্তোলিত সামান্য পরিমাণ গ্যাস অবশিষ্ট রয়েছে, যা দিয়ে কোনোমতে সীমিত কিছু চাহিদা মেটানো হচ্ছে। ওয়াশিংটনের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিউবার সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থা এখন এক "মারাত্মক সংকটের" মুখোমুখি।

জ্বালানির এই চরম সংকটের কারণে রাজধানী হাভানাসহ দেশের বেশিরভাগ অংশ দিনে ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন বা ব্ল্যাকআউটের মধ্যে থাকছে। বিদ্যুৎ না থাকায় দেশটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে, স্কুল-কলেজ এবং সরকারি দফতরগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এমনকি কিউবার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি পর্যটন শিল্পও এই নজিরবিহীন বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় ক্ষুব্ধ নাগরিকরা বুধবার হাভানার বিভিন্ন রাস্তায় নেমে বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন।

ঐতিহাসিকভাবে কিউবা তাদের পরিশোধনাগার সচল রাখতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভেনিজুয়েলা ও মেক্সিকোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কিউবাকে জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর চড়া শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর মিত্র এই দুই দেশ কিউবায় তেল পাঠানো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশলগত অবরোধ কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে চারপাশ থেকে চেপে ধরেছে। মে মাসের শুরুতে কিউবান কর্মকর্তাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ওয়াশিংটন নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ এই নিষেধাজ্ঞাকে "অবৈধ ও নিপীড়নমূলক" বলে আখ্যা দিয়েছেন।

এই চরম সংকটের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র কিউবাকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৭৪ মিলিয়ন পাউন্ড) মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেছে। তবে এই সহায়তার পেছনে ওয়াশিংটন একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে—আর তা হলো কিউবার বর্তমান কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় "অর্থবহ সংস্কার" আনতে হবে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, এই সহায়তা কোনো সরকারি তহবিলে দেওয়া হবে না, বরং ক্যাথলিক চার্চ এবং বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক এনজিওর মাধ্যমে সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এখন এটি সম্পূর্ণ কিউবান প্রশাসনের ওপর নির্ভর করছে যে তারা এই শর্ত মেনে সাহায্য নেবে, নাকি নিজেদের জনগণের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা প্রত্যাখ্যান করবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই মানবিক সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের কূটনৈতিক বাদানুবাদ তৈরি হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন যে, হাভানা ইতিমধ্যেই এই ১০০ মিলিয়ন ডলারের মার্কিন সহায়তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে কিউবা সরকার রুবিওর এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিউবান সরকারের মতে, ওয়াশিংটন একদিকে তাদের অবরুদ্ধ করে মারছে, অন্যদিকে সহায়তার নামে রাজনৈতিক চাল চালছে। রান্নার জন্য লাকড়ি ব্যবহারের মতো আদিম যুগে ফিরে যাওয়া কিউবান জনগণের জন্য এই ভূ-রাজনৈতিক লড়াই এখন এক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে।

banner
Link copied!