যুক্তরাজ্যে এইচপিভি টিকা প্রদানের মাধ্যমে ৩০ বছরের কম বয়সী নারীদের জরায়ু মুখের ক্যান্সারে মৃত্যুর ঝুঁকি শূন্যে নেমে এসেছে বলে গত বুধবার চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় জানানো হয়েছে, আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। এই যুগান্তকারী গবেষণার ফলাফল বিশ্বজুড়ে এই টিকার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। জরায়ু মুখের ক্যান্সার সাধারণত তরুণীদের মধ্যে অত্যন্ত আগ্রাসী রূপ ধারণ করে থাকে এবং সময়মতো শনাক্ত না হলে রোগীর জীবন হুমকির মুখে পড়ে। হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভি মূলত শারীরিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়ায় এবং এটিই এই মারাত্মক ক্যান্সারের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। যুক্তরাজ্যে ২০০৮ সাল থেকে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে নিয়মিত এই টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল যার সুফল এখন দৃশ্যমান হচ্ছে।
লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত এবং ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে-র অর্থায়নে সম্পন্ন এই গবেষণায় দেখা গেছে যে ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী কোনো নারী জরায়ু মুখের ক্যান্সারে মারা যাননি। চিকিৎসকদের মতে, এই টিকাদান কর্মসূচি না থাকলে এই সময়ের মধ্যে অন্তত ২৩ জন নারীর মৃত্যু হতে পারত। এর আগে ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে এই একই বয়সী নারীদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২৫ জন। পরবর্তী বছরগুলোতে এই মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে এসেছে, যেমন ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে ১৬ জন, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ২৭ জন এবং ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে মাত্র ৫ জন নারী এই রোগে প্রাণ হারিয়েছেন। এই ধারাবাহিক পতন প্রমাণ করে যে সঠিক সময়ে গণটিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলে একটি মারাত্মক রোগকে প্রায় পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব।
ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে-র প্রধান নির্বাহী মিশেল মিচেল এই ফলাফলকে ক্যান্সার জয়ের অভিযানে একটি অসাধারণ মাইলফলক এবং বড় অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে এইচপিভি টিকা জরায়ু মুখের ক্যানসার শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর এবং এই প্রথম সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে এটি সরাসরি মানুষের জীবন রক্ষা করছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে কিশোর বয়সে এই টিকা দেওয়া হলে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এমনভাবে শক্তিশালী করে যা পরবর্তীতে ভাইরাসের আক্রমণকে নস্যাৎ করে দেয়। বিশ্বের অন্যান্য যেসকল দেশে বর্তমানে এই এইচপিভি টিকা চালু করা হচ্ছে, সেখানকার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও এই ব্রিটিশ মডেলকে অনুসরণ করার তাগিদ দিচ্ছেন।
যা কম স্পষ্ট তা হলো বিশ্বের উন্নয়নশীল এবং স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে যেখানে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি, সেখানে এই জীবন রক্ষাকারী টিকা সাধারণ মানুষের কাছে কতটা দ্রুত এবং সুলভে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। অনেক দেশে এখনো টিকার উচ্চ মূল্য এবং সচেতনতার অভাবের কারণে টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে ল্যানসেটের এই প্রতিবেদনটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীকে টিকাদান কার্যক্রমে অর্থায়ন বাড়াতে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করবে। তারা আরও জোর দিয়ে বলেছেন যে কেবল নারীদের নয়, বরং পুরুষদেরও এই টিকার আওতায় আনা হলে ভাইরাসের সংক্রমণ চক্রটি চিরতরে ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে।
বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন এই গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণের কথা ভাবছেন যা অন্যান্য ক্যানসার প্রতিরোধেও সহায়ক হতে পারে। জরায়ু মুখের ক্যানসার প্রতিরোধে নিয়মিত স্ক্রিনিং বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং এইচপিভি টিকা উভয়ের সমন্বিত ব্যবহারই মৃত্যুর হারকে স্থায়ীভাবে শূন্যে ধরে রাখতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সাফল্যের পর ব্রিটেনের স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের চলমান টিকাদান কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে যাতে শতভাগ কিশোর-কিশোরীকে এর আওতায় আনা যায়। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সমাজ আশা করছে যে এই উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে জরায়ু মুখের ক্যানসারকে বৈশ্বিক তালিকা থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব হবে।
