ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ বেলজিয়ামসহ বেশ কয়েকটি দেশে কারাগারগুলোতে বন্দি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত হওয়ায় জীবনযাত্রার মান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি ও তীব্র কারারক্ষী সংকটের কারণে বন্দিদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বন্দিদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ থমকে গেছে যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী অপরাধ দমনের লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে।পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বেলজিয়ামের ৩৯টি কারাগারে বর্তমানে ১৩ হাজার ৭৩৩ জন বন্দি রয়েছেন, অথচ সেখানে মোট আসন সংখ্যা মাত্র ১১ হাজার ৬৪টি। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৫৪ জন বন্দিকে কারাগারের মেঝেতে তোশক পেতে ঘুমাতে হচ্ছে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৬৭২ জন। শুধু বেলজিয়াম নয়, সাইপ্রাস, স্লোভেনিয়া, ফ্রান্স, ক্রোয়েশিয়া, ইতালি, রোমানিয়া এবং অস্ট্রিয়াতেও কারাগারের ধারণক্ষমতা উপচে পড়ছে। করোনা মহামারির পর থেকে ইউরোপজুড়ে এই বন্দি বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে যার সুনির্দিষ্ট সমাধান এখনো মেলেনি।
কারাগারগুলোতে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং তীব্র কর্মী সংকটের কারণে বন্দিদের দিনের প্রায় ২২ থেকে ২৩ ঘণ্টা সেলের ভেতরেই কাটাতে হয়। বিলাল নামের ৩৪ বছর বয়সী এক সাবেক বন্দি তার ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, ৯ বর্গমিটারের ছোট একটি সেলে তিন থেকে চারজন বন্দিকে একসঙ্গে রাখা হতো। সেখানে ছোঁয়াচে রোগ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেন্ট-গিলস কারাগারের বন্দি ২৩ বছর বয়সী লোইক জানান, সেখানে বন্দিদের কাজ বা অন্য কোনো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হয় না। এর ফলে সাজা শেষে বন্দিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা এবং কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বেলজিয়ামে অপরাধের সাজা হিসেবে ইলেকট্রনিক মনিটরিংয়ের পরিবর্তে সরাসরি কারাদণ্ড দেওয়ার প্রবণতা বাড়ায় এ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বেলজিয়ামের বিচার মন্ত্রণালয় এস্তোনিয়া ও কসোভোর মতো দেশগুলো থেকে কারাগারের কক্ষ ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। সুইডেন ও ডেনমার্কও ইতিমধ্যে এ ধরনের চুক্তি সই করেছে যেখানে অন্য দেশে বন্দি স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপকে সস্তা জনপ্রিয়তাবাদী ও প্রতীকী বলে সমালোচনা করেছেন। বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বেলজিয়ামে অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কারাগারের অবকাঠামো বাড়ানোর চেয়ে বন্দিদের সামাজিক পুনর্বাসন এবং বিকল্প শাস্তির ব্যবস্থা করাই এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র টেকসই পথ।
