ভেনেজুয়েলায় দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার দুই সপ্তাহ পার হলেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির উপকূলে অবস্থিত লা গুয়াইরা এলাকায় এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ৩,৮১১ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে নিখোঁজ মানুষের প্রকৃত সংখ্যা এখনো অজানা, যা পরিবারগুলোকে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। অনেক পরিবার সরকারি সাহায্যের আশায় বসে না থেকে নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে প্রিয়জনদের খোঁজার চেষ্টা করছেন।
ভূমিকম্পের শিকার আদোলফো গুয়েরা এমনই একজন বাবা, যিনি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূর থেকে এসে লা গুয়াইরা এলাকায় ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষা করছেন। তার ২৩ বছর বয়সী মেয়ে আলেক্সান্দ্রা এখনো নিখোঁজ। আদোলফো তার স্ত্রী ও অন্য সন্তানকে নিয়ে কোনোমতে একটি তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছেন। সেখানে নেই কোনো মৌলিক সুবিধা। গরম আবহাওয়ায় ধুলোবালি আর পচা গন্ধের মধ্যে তিনি এখনো বিশ্বাস করেন তার মেয়ে হয়তো বেঁচে আছে। গুয়েরার মতো আরও হাজার হাজার পরিবার সেখানে ধ্বংসস্তূপের নিচে স্বজনদের সন্ধানে দিন গুনছেন।
ক্রাউডফোর্সিং ওয়েবসাইটগুলোতে প্রায় ৪০ হাজার নিখোঁজের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে এই তালিকায় একই নাম একাধিকবার থাকতে পারে বা অনেকে ইতিমধ্যে খুঁজে পাওয়া গিয়ে থাকতে পারে। লা গুয়াইরা এবং রাজধানী কারাকাসের দেয়ালে দেয়ালে এখন সারি সারি নিখোঁজ মানুষের পোস্টার। উদ্ধারকর্মীরা এ পর্যন্ত ৬,৪৬২ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে এখন কেবল মৃতদেহ শনাক্ত করার করুণ বাস্তবতা সামনে আসছে।
লা গুয়াইরার একটি ফিউনারেল পার্লারে এখন ছোট ছোট কাঠের বাক্সের স্তূপ দেখা যায়। যাদের শনাক্ত করা গেছে এবং দাহ করা হয়েছে, তাদের দেহাবশেষ এসব বাক্সে রাখা আছে। কর্মীরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর এত বেশি দেহ এসেছে যে তারা গুনে শেষ করতে পারছেন না। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অনেক দেহ অনেক আগেই পচন ধরায় আঙুলের ছাপ নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছবি তুলে রাখা হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে শনাক্ত করা যায়। অনেক মৃতদেহ লা এস্পেরানজা এলাকায় গণকবরে সমাধিস্থ করা হচ্ছে।
ইউএনডিপির প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের ফলে লা গুয়াইরা এলাকায় প্রায় ১২ লক্ষ টন ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে। পুরো এলাকা এখন সমতলভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফিউনারেল পার্লারের কর্মী সান্তিয়াগো রদ্রিগেজ আশঙ্কা করছেন, ধ্বংসস্তূপ সরানোর সময় ভারী যন্ত্রপাতির আঘাতে নিচে চাপা পড়া দেহগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে সরকারি সহযোগিতা যথেষ্ট নয় এবং এর ফলে আরও অনেক প্রাণ অকালে ঝরছে। ১৯৯৯ সালের ভয়াবহ ভূমিধসের দুঃস্মৃতি ফিরিয়ে এনে এই দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষ চিরতরে হারিয়ে যেতে পারেন বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
