যুক্তরাজ্যের একটি কিশোর সামরিক প্রশিক্ষণ কলেজে একাধিক নারী সদস্য ভয়াবহ যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে বিবিসি নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নর্থ ইয়র্কশায়ারের হ্যারোগেট শহরে অবস্থিত আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো ঘটেছে। গত ৫ বছরে ওই প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নেওয়া চারজন তরুণী জানিয়েছেন, তাদের বয়স যখন ১৭ বছর, ঠিক তখনই তারা এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। তারা কলেজটির ভেতরে চরম নারীবিদ্বেষ এবং লাগামহীন যৌন সহিংসতার একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতির কথা তুলে ধরেছেন। এসব অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, এই প্রতিবেদনগুলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং গুরুতর। তিনি আরও বলেন, সশস্ত্র বাহিনীতে এ ধরনের অপরাধমূলক আচরণের কোনো স্থান নেই।
টিলি ছদ্মনামের এক প্রাক্তন নারী সদস্য জানিয়েছেন, কয়েকজন জুনিয়র সেনা সদস্য তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ধর্ষণ করে। তিনি জানান, আক্রমণকারীরা তাকে একটি ঘরে ডেকে নিয়ে যায় এবং এরপর তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নিপীড়ন চালায়। এই ঘটনার মাত্র দুই সপ্তাহ পর তিনি সেনাবাহিনী ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বিবিসি নিউজ জানিয়েছে, টিলি বিষয়টি পুলিশকে জানালেও শেষ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলিরা নর্থ ইয়র্কশায়ার পুলিশের ওই তদন্তকে সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
অন্যান্য নারী সদস্যরাও একই রকম ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। মনিকা নামের আরেকজন নারী জানান, এক সহকর্মী সেনা তাকে একটি ঘরে আটকে রেখে যৌন নিপীড়ন করে। পরে তিনি কোনোমতে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আত্মরক্ষা করেন। তৃতীয় এক সদস্যের মা জানিয়েছেন, তার মেয়ের কক্ষের দরজার তালা ভাঙা থাকায় পুরুষ সেনাদের প্রবেশ ঠেকাতে তাকে দরজার সামনে মেঝেতে ঘুমাতে হতো। চতুর্থ আরেক নারী অভিযোগ করেন, প্রশিক্ষকরা নিয়মিত নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করতেন এবং অনুমতি ছাড়াই মেয়েদের থাকার ঘরে ঢুকে পড়তেন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত সরকারি পরিসংখ্যানে এই সংকটের ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত ওই কলেজে অশালীন যৌন আচরণের মোট ১৭৬টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি অভিযোগ ছিল স্থায়ী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এবং বাকি ১৪৪টি অভিযোগ ছিল জুনিয়র সেনাদের বিরুদ্ধে। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় জানা গেছে, গত জুন মাস পর্যন্ত এক বছরে ওই কলেজ সংশ্লিষ্ট ১৬টি যৌন অপরাধের অভিযোগ পেয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।
যুক্তরাজ্যে ১৯ বছরের কম বয়সী তরুণদের জন্য আর্মি ফাউন্ডেশন কলেজ হলো সামরিক প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। হ্যারোগেট ক্যাম্পাসে বর্তমানে মোট ৮৮৯ জন জুনিয়র সেনার মধ্যে মাত্র ৭০ জন নারী রয়েছেন। সেনাবাহিনী ভুক্তভোগীদের সহায়তার জন্য কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলেও, এমন ঘটনা প্রমাণ করে যে প্রতিষ্ঠানটিতে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, গত ৫ বছরে কলেজটির বেশ কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক প্রশিক্ষক শারীরিক ও যৌন সহিংসতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো, সদ্য গৃহীত এসব সংস্কারমূলক পদক্ষেপ ভবিষ্যতের কিশোরী সদস্যদের সুরক্ষায় বাস্তবে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
