আন্তর্জাতিক ও লেবাননের একাধিক মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করেছে যে ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে লেবানিজ সাংবাদিক আমাল খলিলকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা করেছে এবং গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা সহায়তায় বাধা দিয়েছে, যা সম্পূর্ণ যুদ্ধাপরাধ বলে আল জাজিরা এবং ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি বৃহস্পতিবার তাদের যৌথ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে। গত বাইশ এপ্রিল দক্ষিণ লেবাননের আল-তিরিতে এই ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় আল-আখবার পত্রিকার এই অভিজ্ঞ প্রতিবেদক নিহত হন এবং তার সঙ্গে থাকা ফটোসাংবাদিক জয়নব ফারাজ অত্যন্ত গুরুতরভাবে আহত হন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং লেবানিজ অধিকার গোষ্ঠী দ্য লিগ্যাল এজেন্ডা বৃহস্পতিবার এই হামলার ওপর তাদের পরিচালিত পৃথক পৃথক তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করেছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলো অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছে যে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এই হামলা মূলত বেসামরিক নাগরিক এবং তাদের সম্পদের ওপর একটি সুস্পষ্ট ও সুপরিকল্পিত আক্রমণ ছিল। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের এই চরম লঙ্ঘনকে সরাসরি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর যৌথ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার সময় ওই এলাকার আকাশে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একাধিক ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার উপস্থিত ছিল এবং তারা স্পষ্টভাবেই জানত যে ওই নারীরা সম্পূর্ণ বেসামরিক নাগরিক। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক হামলার পর নিজেদের গাড়ি ছেড়ে ওই দুই সাংবাদিক জীবন বাঁচাতে কাছাকাছি একটি আবাসিক ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এরপর লেবানিজ রেড ক্রস সংস্থা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ইউনিফিলের মাধ্যমে ওই সাংবাদিকদের সেখান থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে জরুরি আবেদন জানায়। কিন্তু সেই মানবিক আবেদন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ইসরায়েলি বাহিনী ওই ভবনের ওপর সরাসরি বোমা হামলা চালায়।
সংবাদমাধ্যমে কর্মরত পেশাদার সাংবাদিকদের সুরক্ষার বিষয়ে জেনেভা কনভেনশনে সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বারবার এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথ রুদ্ধ করতেই পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের ভয়াবহ আক্রমণ চালানো হচ্ছে। সাংবাদিকদের ওপর এমন পদ্ধতিগত হামলা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন প্রবাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লেবানন বিষয়ক গবেষক রামজি কাইস এই ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী মুখে দাবি করে যে তারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায় না, কিন্তু মাঠপর্যায়ের ঘটনা এবং সংগৃহীত প্রমাণ বারবার তাদের এই দাবির বিপরীত চিত্রই তুলে ধরে। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে সাংবাদিকদের ওপর চালানো ধারাবাহিক হামলার সর্বশেষ শিকার হলেন আমাল খলিল এবং জয়নব ফারাজ। কাইসের মতে, কোনো ধরনের শাস্তির ভয় না রেখেই ইসরায়েলি বাহিনীর এমন নির্মম অপরাধ করার প্রবণতা বিশ্ববাসীর সামনে তাদের বেপরোয়া মনোভাবকেই প্রমাণ করে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এই সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং জোরালো দাবির পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এই নির্দিষ্ট ঘটনায় কোনো স্বাধীন তদন্ত শুরু করবে কি না। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনা যুদ্ধক্ষেত্রে কর্মরত সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তার চরম অভাব এবং আন্তর্জাতিক আইনের বর্তমান অসহায়ত্বকে আরও একবার বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।
