সৌদি আরবের পবিত্র মদিনা নগরীর মসজিদে নববীর সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী ও পবিত্র অংশ হলো রওজা মোবারক। এই পুণ্যভূমিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ (স.) এবং তাঁর দুই পরম বিশ্বস্ত সহচর ও ইসলামের প্রথম দুই খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত ওমর (রা.)। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মুসলিম যখন হজ ও ওমরাহ পালন করতে মদিনায় আসেন, তখন রওজা জিয়ারতের সময় একটি দৃশ্য সবার নজর কাড়ে।
রওজা মোবারকের চারপাশটি অত্যন্ত নিখুঁত ও সুন্দর পিতল ও তামার তৈরি ধাতব জালি দিয়ে ঘেরা থাকলেও, সেখানে ভেতরে প্রবেশের জন্য কোনো দৃশ্যমান দরজা কিংবা জানালা চোখে পড়ে না। অনেক সাধারণ মুমিনের মনেই এই প্রশ্নটি জাগে যে ইসলামের এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটিকে কেন সম্পূর্ণ দরজাহীন ও জানালাহীন একটি নিরেট কাঠামোর মধ্যে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। এই রহস্যের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাস, মুসলিম শাসকদের স্থাপত্যশৈলী এবং নিখাদ ধর্মীয় সুরক্ষার এক সুদীর্ঘ পরিক্রমার মধ্যে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পবিত্র স্থানটি মূলত কোনো সাধারণ কবরস্থান ছিল না, বরং এটি ছিল উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)-এর ছোট একটি ব্যক্তিগত কক্ষ বা হুজরা। ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত দুঃখজনক অধ্যায় নবীজি (স.)-এর ওফাতের পর তাঁর দাফনের স্থান নির্বাচন নিয়ে সাহাবিদের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছিল। অনেকেই জান্নাতুল বাকিতে বা অন্য কোনো ঐতিহাসিক স্থানে দাফনের প্রস্তাব করেছিলেন।
সেই জটিল মুহূর্তে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) সাহাবিদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান যে নবীজি (স.) নিজে বলেছিলেন, কোনো নবীকেই আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী থেকে বিদায় দেন না তাঁর সেই প্রিয় স্থানে দাফন করা ছাড়া, যেখানে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এই অকাট্য প্রমাণের পর সাহাবি হজরত আবু তালহা (রা.) নবীজির পবিত্র বিছানাটি সরিয়ে নেন এবং কক্ষের ঠিক সেই স্থানেই একটি বগলি কবর খনন করেন, যেখানে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) ১৩ হিজরিতে এবং দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) ২৪ হিজরিতে ইন্তেকাল করলে তাদেরও নবীজি (স.)-এর পবিত্র ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে এই কক্ষের ভেতরেই দাফন করা হয়। এই তিনটি পবিত্র কবরের বিন্যাস অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত। মহানবী (স.)-এর বুক বরাবর হজরত আবু বকর (রা.) এবং তাঁর ঠিক বুক বরাবর হজরত ওমর (রা.) শায়িত আছেন।
তাঁদের সবার মাথা মসজিদে নববীর দিকে, পা জান্নাতুল বাকির দিকে এবং পবিত্র মুখমণ্ডল কেবলার দিকে ফিরিয়ে রাখা হয়েছে। নবীজি (স.)-এর ইন্তেকালের পরও হজরত আয়েশা (রা.) আমৃত্যু এই কক্ষের অবশিষ্টাংশে বসবাস করতেন। তবে হজরত ওমর (রা.)-এর দাফনের পর হুজরাটির ভেতর তিনি একটি সুরক্ষামূলক পর্দা বা কাপড় টেনে নিয়েছিলেন। হজরত আয়েশা (রা.)-এর মৃত্যুর পর সেই হুজরায় সাধারণ মানুষের প্রবেশের পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পঞ্চকোণ বিশিষ্ট দেয়াল ও দরজাহীন অবকাঠামোর সূচনা
সময়ের সাথে সাথে মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ ও সুরক্ষার স্বার্থে রওজা মোবারকের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোতে বিভিন্ন যুগে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছিল। প্রথম কাঠামোগত পরিবর্তনটি আসে ১৭ হিজরিতে, যখন খলিফা হজরত ওমর (রা.) হুজরা মোবারকের আদি খেজুরগাছের ডাল ও পাতার তৈরি দুর্বল দেয়ালটি সরিয়ে সেখানে প্রথম পাকা দেয়াল নির্মাণ করেন। তবে রওজা মোবারকের সুরক্ষায় সবচেয়ে যুগান্তকারী এবং দূরদর্শী পরিবর্তনটি এনেছিলেন উমাইয়া খলিফা ওমর ইবনুল আবদুল আজিজ (রহ.)। তিনি ৮৮ থেকে ৯১ হিজরির মধ্যবর্তী সময়ে মদিনার গভর্নর থাকাকালীন রওজা মোবারকের চারপাশ ঘিরে কালো পাথর দিয়ে একটি অত্যন্ত মজবুত ও স্থায়ী দেয়াল নির্মাণ করেন। এই দেয়ালটি নির্মাণের সময় তিনি দুটি বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন।
প্রথমত, তিনি দেয়ালটির নকশা কাবা শরিফের মতো চার কোণবিশিষ্ট না করে ইচ্ছাকৃতভাবে পঞ্চকোণবিশিষ্ট বা পাঁচ কোণার কোণ তৈরি করেছিলেন। এর প্রধান আকিদাগত কারণ ছিল যেন সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে এই স্থানটিকে কাবার মতো মনে না করে এবং কেউ যেন রওজা মোবারকের চারপাশ দিয়ে তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করার কোনো সুযোগ না পায়। দ্বিতীয়ত, তিনি এই কালো পাথরের তৈরি কক্ষটিকে সম্পূর্ণ দরজাহীন ও জানালাহীন হিসেবে তৈরি করেন।
দেয়ালটি চারপাশ থেকে এমনভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যাতে পৃথিবীর কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সরাসরি সেই মূল হুজরার ভেতরে প্রবেশ করা বা কবরের ওপর সরাসরি দৃষ্টিপাত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেই উমাইয়া আমল থেকেই মূলত রওজা মোবারকের মূল কক্ষটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও সিলগালা অবস্থায় রয়েছে।
সিসার দুর্ভেদ্য প্রাচীর ও মাকসুরার বহুমুখী নিরাপত্তা বেষ্টনী
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, উমাইয়া আমলের পর আব্বাসীয় ও মামলুক যুগেও এই সুরক্ষাকে আরও জোরদার করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। ৫৫৭ হিজরিতে খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের একটি গোপন ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য সুলতান নুরুদ্দিন আদিল আশ-শহীদ এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি জানতে পারেন যে কিছু দুষ্কৃতকারী সুড়ঙ্গ খুঁড়ে নবীজির পবিত্র দেহ মোবারকের দিকে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
এই খবর পাওয়ার পরপরই সুলতান মদিনায় ছুটে আসেন এবং রওজা মোবারকের চারপাশে মাটির গভীরে একটি বিশাল পরিখা খনন করার নির্দেশ দেন। সেই গভীর পরিখাটি খনন করার পর সেখানে টন কে টন গলানো সিসা ঢেলে দেওয়া হয়। এই গলানো সিসা শক্ত হয়ে মাটির নিচে একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করে, যা আজও রওজা মোবারককে যেকোনো ধরনের সুড়ঙ্গ বা ভূগর্ভস্থ আক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখছে।
পরবর্তী সময়ে ৬৬৮ হিজরিতে সুলতান রোকনুদ্দিন জহির বাইবার্স রওজার চারপাশ ঘিরে একটি দৃষ্টিনন্দন কাঠের ফ্রেম বা কাঠামো তৈরি করেন। এর প্রায় দুই শতাব্দী পর ৮৮৭ হিজরিতে সুলতান কায়িতবা সেই কাঠের কাঠামো সরিয়ে বর্তমানের বিখ্যাত তামা ও লোহার জালি দিয়ে একটি স্থায়ী বেষ্টনী তৈরি করেন, যা ইসলামিক স্থাপত্যে `মাকসুরা` নামে পরিচিত।
এই মাকসুরার বাইরের দেয়ালে মূলত চারটি আলংকারিক দরজা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে দক্ষিণ দিকে বাবুত তাওবা, উত্তর দিকে বাবুত তাহাজ্জুদ, পূর্ব দিকে বাবুল ফাতেমা এবং পশ্চিম দিকে বাবুন নাবি অবস্থিত। এই দরজাগুলো শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় বিশেষ মেহমান বা পরিচ্ছন্নতার কাজের জন্য অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ব্যবহৃত হয়, তবে এই দরজাগুলো খুললেও ভেতরের সেই ওমর ইবনুল আবদুল আজিজের তৈরি নিরেট পঞ্চকোণ দেয়ালটিই সামনে আসে, মূল কবরের কাছে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।
একই সাথে রওজা মোবারকের ওপর অবস্থিত বিশ্বখ্যাত `সবুজ গম্বুজ` বা গ্রিন ডোম-এর ইতিহাসও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ৬৭৮ হিজরিতে সুলতান মুহাম্মাদ ইবন কালাউনের আমলে রওজার ওপর প্রথম কাঠের গম্বুজ নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীতে উসমানীয় বা অটোমান সুলতান মাহমুদ ইবন আবদুল হামিদের আমলে ১২৩৩ হিজরিতে এই গম্বুজটি নতুন করে পাথর দিয়ে অত্যন্ত মজবুতভাবে তৈরি করা হয়।
১২৫৩ হিজরিতে সুলতান আবদুল হামিদ এই গম্বুজটিকে প্রথম গাঢ় সবুজ রঙ করার নির্দেশ দেন এবং তখন থেকেই এটি সারা বিশ্বের মুসলিমদের কাছে সবুজ গম্বুজ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সুতরাং, রওজা মোবারকের ভেতরে কোনো দরজা বা জানালা না থাকার পেছনে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন এক সুদূরপ্রসারী আকিদাগত ও বাস্তব নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা কিয়ামত পর্যন্ত এই পবিত্রতম স্থানকে যেকোনো ধরনের শিরক ও বাহ্যিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখবে।
