পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আদ, সামুদ, লুত (আ.)-এর জাতি এবং ফেরাউনের সম্প্রদায়ের মতো অবাধ্য জাতিগুলোর ধ্বংসের ঘটনা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। তবে ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, আল্লাহ কোনো জাতিকে আকস্মিকভাবে বা কারণ ছাড়া ধ্বংস করেন না। বরং তাদের পাপাচার ও অবাধ্যতার চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে তিনি বারবার সতর্ক করেন এবং ফিরে আসার সুযোগ দেন। এই সতর্কতার প্রক্রিয়া বিভিন্ন ধাপে সম্পন্ন হয়, যা আল্লাহর অসীম দয়া ও বিচারের নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রথম পর্যায়ের সতর্কতা আসে নবী ও রাসুল পাঠানোর মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি কোনো রাসুল প্রেরণ না করা পর্যন্ত কাউকে শাস্তি প্রদান করেন না (সূরা বনি ইসরাঈল, ১৭:১৫)। কোনো জনপদ এমন নেই যেখানে সতর্ককারী প্রেরিত হয়নি (সূরা ফাতির, ৩৫:২৪)। এমনকি কোনো জাতি দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলেও আল্লাহ তাদের শাস্তি দেন না। এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের নিদর্শন যে, অধিবাসীরা যখন গাফেল থাকে বা সত্য সম্পর্কে অবগত হয় না, তখন জনপদসমূহকে অন্যায়ের জন্য ধ্বংস করা তাঁর নীতি নয় (সূরা আনআম, ৬:১৩১)।
যখন নবী ও রাসুলদের সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়, তখন দ্বিতীয় ধাপে আল্লাহ দুর্ভিক্ষ, বিপদ ও বিভিন্ন সংকটের মাধ্যমে জাতিকে জাগিয়ে তোলেন। আল্লাহ বলেন, তাদেরকে অভাব-অনটন ও রোগ-শোক দ্বারা পীড়িত করেছি, যাতে তারা বিনয়ী হয় (সূরা আনআম, ৬:৪২)। এই সংকটগুলো শাস্তির চূড়ান্ত পর্যায় নয়, বরং এগুলো হলো একটি আধ্যাত্মিক আহ্বান, যাতে মানুষ নিজেদের ভুল বুঝতে পারে এবং অহংকার ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। এই সংকটের সময়গুলোই হলো মানুষের জন্য আত্মোপলব্ধির প্রকৃত সময়।
তৃতীয় পর্যায়ে আল্লাহ সমাজের নেককার ও সচেতন মানুষদের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পৌঁছান। এটি হলো সমাজের শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ যদি কোনো অত্যাচারীকে অত্যাচারে লিপ্ত দেখেও তার দুহাত চেপে ধরে তাকে প্রতিহত না করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা শীঘ্রই তাদের সকলকে ব্যাপক শাস্তিতে নিক্ষিপ্ত করবেন (জামে তিরমিজি, ২১৬৮)। কুরআন বলছে, তোমরা সেই ফিতনাকে ভয় করো, যা শুধু তোমাদের মধ্যকার জালিমদের ওপরই আপতিত হবে না (সূরা আনফাল, ৮:২৫)। অর্থাৎ, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা একটি সামষ্টিক দায়বদ্ধতার অভাব, যা গোটা সমাজকে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়টি হলো ইস্তিদরাজ। যখন সব সুযোগ ও সতর্কতা দেওয়ার পরও কোনো জাতি অহংকারে অটল থাকে, তখন আল্লাহ উল্টো তাদের ভোগ-সম্পদ বাড়িয়ে দেন। কুরআন বলছে, যখন তারা তাদেরকে যা উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তা ভুলে গেল, তখন আমি তাদের জন্য সবকিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে যখন তারা প্রদত্ত বিষয়ে উল্লসিত হলো, তখন আমি হঠাৎ তাদের পাকড়াও করলাম (সূরা আনআম, ৬:৪৪)। এটি হলো চূড়ান্ত পাকড়াওয়ের আগের শেষ ধাপ, যেখানে মানুষ দুনিয়াবী সফলতায় মত্ত হয়ে আখেরাত ও আল্লাহর শাস্তিকে ভুলে যায়।
পরিশেষে, কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগ বা বিপদকে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর গজব ঘোষণা করার অধিকার মানুষের নেই, কারণ গায়িবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর। তবে কুরআন ও হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, পাপাচার ও জুলুমের বিস্তার এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা আল্লাহর শাস্তির কারণ হতে পারে। তাই প্রত্যেক ব্যক্তি ও সমাজের কর্তব্য হলো তওবা, ইস্তেগফার, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং আল্লাহর বিধানের দিকে ফিরে আসা। কেয়ামতের দিনও জাহান্নামিদের জিজ্ঞেস করা হবে তাদের কাছে সতর্ককারী এসেছিল কি না। তারা স্বীকার করবে যে এসেছিল কিন্তু তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল (সূরা মুলক, ৬৭:৮-৯)। তাই এই জীবনই হলো নিজেকে সংশোধন করার একমাত্র সুযোগ।
