অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে সাত মাস বয়সী এক ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শহরের টেল রুমিদা এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। শিশুটির নাম স্যাম আবু হাইকাল। আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শিশুটির বাবা ফাহদ আবু হাইকাল যখন গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ একদল ইসরায়েলি সেনা গুলি চালালে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
ঘটনার দিন ফাহদ আবু হাইকাল তার স্ত্রী দানিয়া সালামাহ ও দুই সন্তানকে নিয়ে গাড়িতে ছিলেন। তারা তাদের পরিবারের এক সদস্যকে হেবরনের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যাচ্ছিলেন। টেল রুমিদা এলাকাটি অধিকৃত পশ্চিম তীরের অন্যতম সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের ভাষ্যমতে, এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি দেখে ফাহদ গাড়ি থামিয়ে দিয়েছিলেন এবং নিজের হাত উপরে তুলে কোনো ধরনের হুমকি না থাকার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এরপরও একজন সেনা লক্ষ্য করে গুলি চালান।
একটি বুলেট গাড়ির সামনের কাঁচ ভেদ করে প্রথমে ফাহদের হাতে আঘাত করে এবং পরে গাড়ির পেছনে থাকা শিশু স্যামের মুখে লাগে। এতে ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হয়। একই বুলেটটি শিশুটির মা দানিয়া সালামাহর চোয়ালের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে যায়। তার শরীরের ভেতরে একটি বুলেটের টুকরো হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি আটকে আছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। তবে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় অস্ত্রোপচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ফাহদ আবু হাইকাল জানিয়েছেন, গুলি চালানোর পর সেনারা কোনো প্রকার সহায়তা প্রদান না করেই ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। তিনি দ্রুত অন্য একটি গাড়ি থামিয়ে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যান। ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফাহদ তার সন্তানের মৃত্যুর বিচার চেয়ে এবং দায়ী সেনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে সেনাবাহিনী এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা যোগাযোগের উদ্যোগ নেয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
হেবরন শহরটি বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি অবরুদ্ধ এলাকার মতো হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইব্রাহিমি মসজিদ ও কিরিয়াত আরবা বসতি সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। স্থানীয় পরিবারগুলো এই এলাকায় তাদের বসতভিটা নিয়ে প্রতিনিয়ত উদ্বেগের মধ্যে থাকেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার ঘটনা বহুগুণ বেড়েছে। হেবরনের এই ঘটনার পর স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, কোনো ধরনের প্ররোচনা ছাড়াই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে এমন নির্বিচারে গুলি চালানো মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
শিশুটির মৃত্যুতে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে। দানিয়া সালামাহর গুরুতর শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি মানসিক আঘাত তাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ফাহদ জানিয়েছেন, তাদের বড় ছেলে কিনান তার ছোট ভাইকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিবারটি এখন শোকের সাগরে নিমজ্জিত। এই হত্যাকাণ্ড পশ্চিম তীরে চলমান অস্থিরতা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ঝুঁকিকে আবারও সামনে নিয়ে এল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বারবার এই ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানালেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
