শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩

একই মাটিতে ভিন্ন স্বাদের ফল সৃষ্টির রহস্য ও আল্লাহর কুদরত

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৯, ২০২৬, ০৯:২৩ পিএম

একই মাটিতে ভিন্ন স্বাদের ফল সৃষ্টির রহস্য ও আল্লাহর কুদরত

পবিত্র মক্কায় ইসলামিক গবেষকরা শুক্রবার পবিত্র কোরআনের বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক নির্দেশনাবলী নিয়ে এক বিশেষ সেমিনারে একই মাটি ও পানি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন ফলের বৈচিত্র্যময় স্বাদের অলৌকিক রহস্য এবং আল্লাহর কুদরত আলোচনা করেছেন বলে উম্মাহ কণ্ঠ নিশ্চিত করেছে। মানবজাতি প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু ফল আহার করলেও খুব কম মানুষই এই প্রাকৃতিক শৃঙ্খল নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। একটি নির্দিষ্ট বাগানের দিকে তাকালে আম, জাম, লিচু কিংবা লেবুর মতো হরেক রকমের ফলদ বৃক্ষ পাশাপাশি বেড়ে উঠতে দেখা যায়। এই উদ্ভিদগুলো একই ভূমি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করছে এবং একই আকাশের বৃষ্টিতে সিক্ত হচ্ছে।

একই উৎস থেকে উপাদান গ্রহণ করার পরেও আমের মিষ্টি রস, লেবুর তীব্র টক ভাব কিংবা জলপাইয়ের কষযুক্ত স্বাদের এই বৈচিত্র্য মানুষকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। পবিত্র কোরআন আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশত বছর আগে মানুষের চিন্তাশীল মনকে এই বিশেষ প্রাকৃতিক নিদর্শনের দিকে আকর্ষণ করেছে। সূরা আর-রাদের চার নম্বর আয়াতে এই বাস্তবতার এক অনুপম বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে (সূরা আর-রাদ, ১৩:৪)। সেখানে বলা হয়েছে যে পৃথিবীতে একে অপরের সংলগ্ন বিভিন্ন ভূখণ্ড, আঙুরের বাগান, শস্যক্ষেত এবং খেজুর গাছ রয়েছে যার কিছু একই মূল থেকে এবং কিছু পৃথক মূল থেকে জন্মানো।

ঐশী গ্রন্থে বর্ণিত এই সকল উদ্ভিদ একই পানি দ্বারা সিঞ্চিত হলেও স্বাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা এগুলোর কতককে কতকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব বা ভিন্নতা দান করেছেন। মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ফলের রঙ, আকার এবং স্বাদের এই বৈচিত্র্যকে আল্লাহর কুদরত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যা কেবল বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এক বড় নিদর্শন। আয়াতের পরিভাষায় উদ্ভিদের শিকড়ের বিন্যাস এবং একই মূল থেকে একাধিক কাণ্ড গজানোর যে অনন্য শারীরিক গঠন বর্ণিত হয়েছে তা আধুনিক বিজ্ঞানকেও বিস্মিত করে। প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম বিন্যাস কেবল কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না বরং এর পেছনে এক মহান পরিকল্পনাকারীর উপস্থিতি স্পষ্ট।

modern উদ্ভিদবিজ্ঞান ফলের এই স্বাদের পার্থক্যকে ব্যাখ্যা করার জন্য উদ্ভিদের জিনগত গঠন এবং মাটি থেকে শোষিত খনিজের জটিল রাসায়নিক রূপান্তরকে দায়ী করে। গাছের অভ্যন্তরীণ কোষগুলো শর্করা এবং অম্লতার এক সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য বজায় রেখে ফলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তৈরি করে যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। এখানে বিশ্বাসী মনের সাথে বিজ্ঞানের কোনো মৌলিক সংঘাত তৈরি হয় না কারণ বিজ্ঞান কেবল প্রক্রিয়াটি কীভাবে ঘটে তা ব্যাখ্যা করে। অন্যদিকে একজন মুমিন বা বিশ্বাসী মানুষ এই সুনিপুণ ব্যবস্থার পেছনের চালিকাশক্তি তথা পরম সৃষ্টিকর্তার প্রজ্ঞার অনুসন্ধান করে।

জিনগত বৈচিত্র্য এবং প্রজাতিভেদে এই ভিন্নতা তৈরি হওয়ার পেছনে যে প্রাকৃতিক নিয়ম কাজ করছে তা মূলত আল্লাহর কুদরত এবং তার সৃষ্টিশৈলীর অন্যতম অংশ। বিবর্তন তত্ত্ব বা আধুনিক জীববিজ্ঞান কখনোই এই দাবি করে না যে একই পরিবেশে বেড়ে ওঠা ভিন্ন প্রজাতির গুণাগুণ সবসময় অভিন্ন হতে হবে। ফলে বিজ্ঞান এবং ধর্মীয় বিশ্বাস এখানে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং মানুষের জন্য দুটি ভিন্ন স্তরের প্রশ্নের ridicu জবাব প্রদান করে। মানুষের জিহ্বায় ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ অনুভব করার যে জৈবিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা ছাড়া প্রকৃতির এই বিপুল আয়োজন উপভোগ করা অসম্ভব হতো।

যা কম স্পষ্ট তা হলো মানব ইতিহাসের আদি লগ্ন থেকে মাটির ভেতরের এই জটিল রাসায়নিক রূপান্তর প্রক্রিয়াটি কীভাবে এত নিখুঁতভাবে নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। বিভিন্ন যুগের বড় বড় বিজ্ঞানীরা এই মাটির উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে একই খনিজ পদার্থ কীভাবে একটি গাছে গিয়ে মিষ্টি এবং অন্য গাছে গিয়ে টক উপাদানে পরিণত হয়। এই বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ মানুষকে এক পরম সত্তার অস্তিত্বের প্রতি ধাবিত করে। প্রকৃতির এই নেপথ্য কারিগরি নিয়ে গভীর গবেষণা বর্তমান যুগের চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নেও নতুন দিগন্তের উন্মোচন করছে।

ইসলামের পবিত্র ঐতিহ্যে নতুন মৌসুমের ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ সুন্নত আমলের উল্লেখ পাওয়া যায় যা মানুষের কৃতজ্ঞতাবোধকে জাগ্রত করে। সহিহ মুসলিমের একটি নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় এসেছে যে সাহাবিগণ যখনই মৌসুমের প্রথম কোনো নতুন ফল লাভ করতেন তা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে রাসুলুল্লাহর কাছে নিয়ে আসতেন (সহীহ মুসলিম, ১৩৭৩)। আল্লাহর রাসুল সেই নতুন ফলটি নিজের হাতে গ্রহণ করে বরকতের দোয়া করতেন এবং উপস্থিত সবচেয়ে ছোট শিশুর হাতে তা পরম স্নেহে তুলে দিতেন। এই পবিত্র আমলটি আমাদের শেখায় যে প্রকৃতির প্রতিটি উপহারকে কেবল ভোগ করাই মুমিনের লক্ষ্য নয় বরং এর পেছনের দাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া আবশ্যক।

মদিনা শহরের ফলের প্রাচুর্য এবং সমৃদ্ধির জন্য রাসুলুল্লাহ যে বরকতের দোয়া করেছিলেন তা মুসলিম উম্মাহর জন্য আজীবন এক বড় ঐতিহাসিক শিক্ষা হিসেবে গণ্য হয়। নতুন ফল খাওয়ার সময় এই আত্মিক সংযোগ মুমিনের অন্তরকে এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয় এবং তাকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবায়। একই মাটির বুক চিরে উৎপন্ন হওয়া এই ভিন্ন স্বাদের ফলগুলোর প্রতিটি কামড়ে মানুষ আল্লাহর কুদরত নতুনভাবে অনুভব করতে সক্ষম হয়। এই বিশ্বচরাচরের প্রতিটি বস্তু এবং তার অভ্যন্তরীণ গুণাবলী কেবল মানুষের সেবায় নিয়োজিত করা হয়েছে যাতে তারা সত্য পথ খুঁজে পায়।

প্রকৃতির এই অনন্য শৃঙ্খলা কেবল ফলের স্বাদেই সীমাবদ্ধ নয় বরং মানুষের অন্তরের পরিবর্তনের ক্ষমতার দিকেও এক বড় আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত প্রদান করে। যিনি মৃত ভূমি থেকে এত বৈচিত্র্যময় জীবন্ত ফলের ধারা প্রবাহিত করতে পারেন তিনি মানুষের কঠিন হৃদয়কেও হেদায়েতের আলোয় নরম করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন। প্রতিটি ফলের স্বাদ তাই কেবল মানুষের শারীরিক তৃপ্তিই মেটায় না... বরং মানুষের চিন্তাশীল মনের জন্য এক বিশাল আধ্যাত্মিক খোরাক জোগায়। মুমিনের জীবন তাই প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম বিন্যাস দেখে সবসময় স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় অবনত হওয়ার এক অবিরত সাধনা। 

banner
Link copied!