ইসলামিক পণ্ডিত ও গবেষকরা শুক্রবার পবিত্র মক্কায় জুমার দিন সুরা কাহাফ তেলাওয়াত মিস হলে করণীয় নিয়ে আলেমদের বিভিন্ন ফতোয়া ও হাদিসের একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন বলে সৌদি প্রেস এজেন্সি জানিয়েছে। পবিত্র জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ আমল হলো এই সুরাটি পাঠ করা যা মুমিন বান্দার জীবনে বিশেষ আত্মিক তাৎপর্য বহন করে। তবে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যস্ততা বা নিছক ভুলে যাওয়ার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ সুরাটি তেলাওয়াত করা সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে জুমার দিনের নির্ধারিত ফজিলত অর্জিত হবে কিনা এবং পরবর্তী সময়ে তা কীভাবে পূরণ করা যাবে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে।
এই আমলটির মূল ভিত্তি মূলত সাহাবি হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত কিছু প্রসিদ্ধ হাদিসের ওপর প্রতিষ্ঠিত যেখানে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করবে তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় নূরে আলোকিত থাকবে। মুস্তাদরাকে হাকেম এবং সুনানে বায়হাকিতে এই সম্পর্কিত একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায় যা পরবর্তী সময়ে আধুনিক যুগের মুহাদ্দিস শাইখ আলবানি সহিহ বলে গণ্য করেছেন। তবে এই হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা বা সনদের মান নিয়ে প্রাচীন যুগের আলেমদের মধ্যে এক ধরনের সূক্ষ্ম মতভেদ বা পর্যালোচনা লক্ষ্য করা যায়। বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম জাহাবি এই বর্ণনার একজন নির্দিষ্ট রাবি নুয়াইম ইবনে হাম্মাদ সম্পর্কে কিছু আপত্তি উত্থাপন করেছেন যা এর নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ইমাম নাসায়ি এবং ইমাম বায়হাকি উভয়েই মত প্রকাশ করেছেন যে এই বর্ণনাটির অধিক বিশুদ্ধ রূপটি মূলত সাহাবির নিজস্ব উক্তি বা মওকুফ হাদিস হিসেবে গণ্য এবং এটি সরাসরি নবীজির বাণী বা মারফু হাদিস নয়। সৌদি আরবের বিশিষ্ট ফকিহ শাইখ আবদুল আজিজ বিন বাজ এই বিষয়ের পৃথক পৃথক বর্ণনাগুলোকে সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করে একে একটি মোস্তাহাব বা উত্তম আমল হিসেবে গ্রহণ করার ফতোয়া দিয়েছেন। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় জুমার দিন বলতে ঠিক কোন সময়কে বোঝানো হবে তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে প্রধানত দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত রয়েছে। একদল আলেমের মতে বৃহস্পতিবারের সূর্যাস্ত থেকে শুরু করে শুক্রবারের সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরো সময়টিই জুমার অন্তর্ভুক্ত এবং এই সময়ে সুরা কাহাফ পাঠ করা যাবে।
অন্যদিকে শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমীন মনে করেন যে শরিয়তের পরিভাষায় দিন বলতে মূলত সুবহে সাদেক বা ফজর থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে বোঝায়। এই ভিন্ন মতের কারণে জুমার আগের রাতে অর্থাৎ বৃহস্পতিবার রাতে সুরাটি তেলাওয়াত করলে জুমার নির্দিষ্ট ফজিলত নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে আলেমদের একাংশ সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তবে সকল ফকিহ এই বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত হয়েছেন যে শুক্রবার মাগরিবের আজানের সাথে সাথে এই বিশেষ ফজিলতের সময়সীমা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। এর পরে অর্থাৎ শুক্রবার সূর্যাস্ত বা মাগরিবের পর সুরা কাহাফ পাঠ করলে তা পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের সাধারণ সওয়াব হিসেবে গণ্য হবে কিন্তু জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা আর প্রযোজ্য হবে না।
যা কম স্পষ্ট তা হলো যারা নিয়মিত এই আমলটি করতেন তারা যদি কোনো ওজরের কারণে তা মিস করেন তবে তাদের জন্য কোনো বিশেষ ক্ষতিপূরণ বা কাজার বিধান ইসলামি শরিয়তে নির্ধারিত আছে কিনা। যেহেতু সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করা কোনো ফরজ বা ওয়াজিব বিধান নয় বরং এটি একটি ঐচ্ছিক বা মোস্তাহাব ইবাদত তাই এটি বাদ পড়লে কোনো গুনাহ হবে না। আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে শুক্রবার ফজরের সালাতের পরপরই তেলাওয়াত সম্পন্ন করে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ ও বিতর্কমুক্ত মাধ্যম। প্রকৃতির এই আধ্যাত্মিক নিয়মগুলো মানুষকে শৃঙ্খলিত জীবনযাপন করতে শেখায় এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর স্মরণকে জাগ্রত রাখার তাগিদ দেয়।
পবিত্র কোরআনের এই বিশেষ সুরার প্রথম দশটি আয়াতের আমল মানুষকে শেষ জামানার সবচেয়ে বড় ফিতনা দাজ্জালের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে বলে অন্যান্য সহিহ হাদিসে প্রমাণিত হয়েছে। অতএব জুমার দিনে এই সুরার নিয়মিত চর্চা কেবল সওয়াব অর্জনের মাধ্যমই নয় বরং এটি ঈমান সুরক্ষার একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করে। আলেম সমাজ সর্বদা সাধারণ মুসলমানদের এই আমলটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য উৎসাহিত করেন যাতে তারা শরিয়তের নির্ধারিত বরকত থেকে বঞ্চিত না হন। উম্মাহ কণ্ঠের এই বিশেষ প্রতিবেদনটি পাঠকদের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামি অনুশাসনগুলো সঠিকভাবে প্রতিপালন করতে এবং নিখুঁত আমল বজায় রাখতে বিশেষভাবে সাহায্য করবে।
