মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩

যে পাঁচ বিপদ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া জরুরি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২২, ২০২৬, ১০:১৬ পিএম

যে পাঁচ বিপদ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া জরুরি

ইসলামিক স্কলাররা সোমবার মক্কায় এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে মানবজীবনের বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক সংকট থেকে সুরক্ষায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশিত বিশেষ দোয়ার গুরুত্ব বিশদভাবে তুলে ধরেছেন বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। মানবজীবনের শান্তি নষ্টকারী এবং দুনিয়াকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট সামাজিক অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মুমিনকে নিয়মিত আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ইমাম তাবরানি সংকলিত একটি নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় দেখা যায় যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঁচটি বিশেষ কঠিন পরীক্ষা থেকে সুরক্ষার জন্য সর্বদা প্রার্থনা করতেন। এই পার্থিব সংকটগুলো মানুষের ঈমান ও পারিবারিক স্থীতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম।

প্রথম প্রধান সংকট হিসেবে একটি ক্ষতিকর ও দুষ্ট প্রতিবেশীর অনিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিষময় করে তোলে। পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ছত্রিশ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ পিতা-মাতার পাশাপাশি প্রতিবেশীর সাথে সর্বোত্তম আচরণ করার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৬)। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা ইসলামে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে সহীহ আল-বুখারীর একটি বর্ণনায় প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া ব্যক্তিকে প্রকৃত মুমিন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি (সহীহ আল-বুখারী, ৬০১৬)। সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্মীয় গবেষকরা মনে করেন যে একটি আদেশ ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ গঠনে প্রতিবেশীদের মধ্যকার পারস্পরিক কল্যাণকামী মনোভাব অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংকট হিসেবে একজন কষ্টদায়ক জীবনসঙ্গী এবং অবাধ্য সন্তানের অবাধ্যতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে যা একটি পরিবারকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। সুরা রুমের একুশ নম্বর আয়াতে বৈবাহিক সম্পর্ককে প্রশান্তি ও dya বা দয়া অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে (সূরা আর-রুম, ৩০:২১)। কিন্তু জীবনসঙ্গী যদি প্রতিনিয়ত মানসিক নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তবে তা মানুষের স্বাভাবিক জীবনীশক্তিকে দ্রুত নিঃশেষ করে দেয় বলে জামে আত-তিরমিজির একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে (জামে আত-তিরমিজি, ৩৮৯৫)। একইভাবে সন্তান যদি মা-বাবার ওপর অন্যায্য কর্তৃত্ব ফলাতে চায় তবে তা একটি পরিবারের সমস্ত সুখ নষ্ট করে দেয় যা সুরা তাগাবুনেই স্পষ্ট পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৪-১৫)।

চতুর্থ সংকটটি হলো এমন বৈষয়িক সম্পদ যা মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধন-সম্পদ মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা মাত্র এবং এটি যেন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে সে বিষয়ে সুরা মুনাফিকুনে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে (সূরা আল-মুনাফিকুন, ৬৩:৯)। সুরা তাওবায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে যারা আল্লাহর নির্দেশিত পথ পরিহার করে অবৈধভাবে সম্পদ মজুত করে তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি অবধারিত (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৩৪)। জামে আত-তিরমিজির ২৩৩৬ নম্বর হাদিস অনুযায়ী প্রতি উম্মতের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ফিতনা বা পরীক্ষা থাকে এবং মুসলিম উম্মাহর প্রধান ফিতনা হলো এই সম্পদ (জামে আত-তিরমিজি, ২৩৩৬)। যা কম স্পষ্ট তা হলো আজকের আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ কীভাবে এই সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনাগুলোকে বাস্তব জীবনে সঠিকভাবে প্রয়োগ করবে।

পঞ্চম এবং শেষ ক্ষতিকর বিষয়টি হলো একজন ধূর্ত ও কপট বন্ধু যে মানুষের ভালো গুণগুলো গোপন রাখে কিন্তু কোনো ত্রুটি দেখলে তা সমাজে ছড়িয়ে দেয়। পবিত্র কোরআনের সুরা যুখরুফের সাতষট্টি নম্বর আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে যে কিয়ামতের দিন মুত্তাকিরা ছাড়া সমস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু একে অপরের চরম শত্রু হয়ে যাবে (সূরা আজ-জুখরুখ, ৪৩:৬৭)। সহীহ আল-বুখারীর একটি বিখ্যাত উপমায় সত্ ও অসত্ সঙ্গীর প্রভাবকে কস্তুরি বিক্রেতা ও কামারের হাঁপরের সাথে তুলনা করে বোঝানো হয়েছে (সহীহ আল-বুখারী, ৫৫৩৪)। এই সমস্ত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়ে ইহকাল ও পরকালে প্রকৃত মুক্তি অর্জনের জন্য প্রতিটি মুসলমানের উচিত সার্বক্ষণিকভাবে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং নিজের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করা।

banner
Link copied!