রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ইহরাম অবস্থায় সহবাস করলে কি হজ বাতিল হয়ে যায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৭, ২০২৬, ০৬:২৮ পিএম

ইহরাম অবস্থায় সহবাস করলে কি হজ বাতিল হয়ে যায়

পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে ইহরাম বাঁধার পর থেকে নির্দিষ্ট কিছু আমল সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত হাজিদের জন্য বেশ কিছু বিষয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ও স্পর্শকাতর বিষয় হলো ইহরাম অবস্থায় সহবাস বা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন যে হজের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস রয়েছে এবং যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে নিজের ওপর হজ অবধারিত করে নেয়, সে যেন হজে কোনো ধরনের সহবাস ও সংশ্লিষ্ট অশ্লীলতা, পাপাচার এবং ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত না হয় (সূরা আল-বাকারা, ২:১৯৭)। তাফসিরকারকদের মতে, এই আয়াতে উল্লিখিত ‍‍`রাফাস‍‍` শব্দটির মাধ্যমে মূলত স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্ক ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত যাবতীয় আচরণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইসলামি শরিয়তে এই নিষিদ্ধ কাজের সময়কাল এবং হজের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন শাস্তিমূলক বিধান ও কাফফারা নির্ধারণ করা হয়েছে।

যদি কোনো হাজি ৯ জিলহজ উকুফে আরাফাহ বা আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের পূর্বে ইহরাম অবস্থায় সহবাসে লিপ্ত হন, তবে জমহুর বা অধিকাংশ ফকিহদের মতে তাঁর হজ সম্পূর্ণ ফাসিদ বা বাতিল হয়ে যাবে। বিখ্যাত ফকিহ ইবনে কুদামা তাঁর আল-মুগনি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে আরাফাতের পূর্বে সহবাস করলে হজ বাতিল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে সমস্ত ওলামায়ে কেরাম একমত পোষণ করেছেন (আল-মুগনি, ৩:৩২৯)। তবে হজ ফাসিদ হয়ে গেলেও হাজি মাঝপথে হজের কাজ ছেড়ে দিতে পারবেন না, বরং সাধারণ হাজিদের মতোই তাঁকে বাকি সব নিয়মকানুন ও আমল সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে এই গুরুতর ভুলের কাফফারা হিসেবে একটি উট বা গরু কোরবানি করা ওয়াজিব হবে এবং পরবর্তী বছর এই হজটি পুনরায় কাজা করতে হবে। কিন্তু যদি কেউ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের পর অথচ হজের প্রথম তাহাল্লুল অর্থাৎ মাথা মুণ্ডন বা চুল কাটার পূর্বে এই নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হন, তবে জমহুর ফকিহদের মতে তাঁর হজ বাতিল হবে না, কিন্তু এটি একটি কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য কাফফারা হিসেবে একটি উট বা গরু কোরবানি করা আবশ্যক (বাদায়েউস সানায়ে, ২:১৮৫; আল-মাজমু, ৭:৩৪৭)।

অন্য দিকে ১০ জিলহজ শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ এবং মাথার চুল কাটার মাধ্যমে যখন প্রথম তাহাল্লুল অর্জিত হয়ে যায়, তখন তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করার পূর্বে যদি কেউ সহবাস করেন, তবে হানাফি মাজহাবের বিধান অনুযায়ী তাঁর হজ বাতিল হবে না। এ ক্ষেত্রে কাফফারা হিসেবে একটি ছাগল বা দুম্বা কোরবানি করা ওয়াজিব হবে (রদ্দুল মুহতার, ২:৫৫০)। এই ধরনের ভুলের ক্ষেত্রে অনেকে অজ্ঞতা বা ভুলবশত করার অজুহাত দিয়ে থাকেন, তবে ইহরামের নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাবে অজ্ঞতাকে ওজর হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। শাফিয়ি মাজহাবে ক্ষেত্রবিশেষে ভুল বা অজ্ঞতাকে ওজর হিসেবে গণ্য করার কিছুটা অবকাশ থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোনো অভিজ্ঞ মুফতির কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট ফতোয়া গ্রহণ করা আবশ্যক।

এই নিষিদ্ধ কাজের ক্ষেত্রে স্ত্রীর বিধানের ক্ষেত্রে ফকিহরা জানিয়েছেন যে স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় ইহরাম অবস্থায় সহবাসে অংশগ্রহণ করেন, তবে স্বামীর মতো তাঁর ওপরও একই বিধান ও কাফফারা প্রযোজ্য হবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পরবর্তী বছর হজ কাজা করতে হবে। কিন্তু স্ত্রীকে যদি এই কাজের জন্য বাধ্য করা হয়, তবে জমহুর ফকিহদের মতে স্ত্রীর ওপর কোনো গুনাহ বা পৃথক কাফফারা আসবে না। এই সব জিনায়াত বা ভুলের কারণে যে পশু কোরবানি করা ওয়াজিব হয়, সেই পশুর গোশত হাজি নিজে বা তাঁর পরিবার ভক্ষণ করতে পারবেন না, বরং সেই গোশত হারাম বা মক্কার সীমানার ভেতরেই জবাই করে ওখানকার দরিদ্র ও মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করা ওয়াজিব। হজ কেবল একটি বাহ্যিক সফর নয়, বরং এটি আল্লাহর দরবারে পূর্ণ আত্মসমর্পণের একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা, তাই ইহরামের পবিত্রতা রক্ষা করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক।

banner
Link copied!