অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের একটি বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। সুপারমার্কেট থেকে কেনা আইসক্রিম থেকে শুরু করে পাউরুটি বা প্যাকেটজাত সসে এমন অনেক রাসায়নিক উপাদান থাকে যা সাধারণ রান্নাঘরে পাওয়া যায় না। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বা ইউপিএফ স্থূলতা, ক্যানসার এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। এসব রোগ মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ হতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রাপ্তবয়স্কদের মোট ক্যালরি গ্রহণের অর্ধেকের বেশি আসে এসব খাবার থেকে। সস্তা এবং সহজে প্রস্তুত করা যায় বলে মানুষ সহজেই এর প্রতি আকৃষ্ট হয়। তবে ঘরে তৈরি কয়েকটি সাধারণ ও সাশ্রয়ী বিকল্পের মাধ্যমে খুব সহজেই এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়ানো সম্ভব।
গরমের সময়ে দোকান থেকে কেনা আইসক্রিমের বদলে ঘরেই তৈরি করা যেতে পারে স্বাস্থ্যকর ডেজার্ট। অতিরিক্ত পেকে যাওয়া কলা এবং চিনিবিহীন কোকো পাউডার একসঙ্গে ব্লেন্ড করে সহজেই আইসক্রিমের স্বাদ পাওয়া সম্ভব। কোকো পাউডারে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া দই জমিয়ে তার সঙ্গে তাজা ফল মিশিয়েও স্বাস্থ্যকর আইসক্রিম তৈরি করা যায়। অন্যদিকে সকালের নাস্তায় দোকানের পাউরুটি বা বেইগেলের বিকল্প হিসেবে ঘরেই বেইগেল বানানো বেশ সহজ। শুধুমাত্র ময়দা এবং দই মিশিয়ে খামির তৈরি করে তা এয়ার ফ্রায়ার বা ওভেনে ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ২০ মিনিট বেক করলেই স্বাস্থ্যকর বেইগেল প্রস্তুত হয়ে যায়। ঘরে তৈরি এই বেইগেল প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামে ভরপুর থাকে, যা হাড় মজবুত করতে সহায়ক।
প্যাকেটজাত টমেটো সসে প্রচুর পরিমাণে কৃত্রিম চিনি এবং সংরক্ষক উপাদান থাকে। এর বদলে পেঁয়াজ এবং রসুন হালকা ভেজে তাতে টমেটো বাটি বা টিনজাত টমেটো এবং তাজা লতাপাতা মিশিয়ে ১০ থেকে ২০ মিনিট জ্বাল দিলে চমৎকার টমেটো সস তৈরি হয়। ফ্রান্সের পাস্তুর ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বেনোয়া চাসাইন বিবিসিকে জানান যে দীর্ঘসময় সংরক্ষণের জন্য প্যাকেটজাত খাবারে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ইমালসিফায়ার ব্যবহার করা হয়। একটি সাধারণ নিয়ম হলো, কোনো খাবারে উপাদানের তালিকা যত ছোট হবে, সেটি অতি-প্রক্রিয়াজাত হওয়ার আশঙ্কা তত কম।
দ্রুত রাতের খাবার হিসেবে অনেকেরই পছন্দ স্টির-ফ্রাই বা সবজি ভাজা। কিন্তু বাজার থেকে কেনা রেডিমেড সস ব্যবহার করলে তাতে অতিরিক্ত লবণ ও চিনির পাশাপাশি অন্তত ২০টির বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করে। এর বিকল্প হিসেবে সয়া সস, মধু, তিলের তেল এবং রসুন মিশিয়ে ঘরেই স্বাস্থ্যকর সস তৈরি করা যায়। লবণ কম আছে এমন সয়া সস ব্যবহার করলে তা অ্যালার্জির উপসর্গ কমানোর পাশাপাশি হজমেও সাহায্য করে।
লবণাক্ত স্ন্যাকস বা চিপসের ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া জরুরি। লন্ডনের কিংস কলেজের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সারাহ বেরি জানান, যেসব খাবারে অনেক বেশি অপরিচিত রাসায়নিক উপাদান থাকে সেগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো। ঐতিহ্যবাহী চিপসে প্রচুর পরিমাণে চর্বি এবং লবণ থাকে। এর পরিবর্তে ঘরে তৈরি পপকর্ন একটি চমৎকার স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে। পপকর্নে ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং পরিপাকতন্ত্র ভালো রাখে। সামান্য তেল বা মাখন দিয়ে প্যানে ঢেকে খুব সহজেই এটি তৈরি করা যায়। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পপকর্ন দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি গলায় আটকে গিয়ে শ্বাসরোধের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দোকানে পাওয়া গ্রানোলা বা প্রোটিন বারগুলো সবসময় স্বাস্থ্যকর হয় না। ঘরে বসেই ওটস, শুকনো ফল এবং বাদাম মিশিয়ে চমৎকার বার তৈরি করা সম্ভব। মিষ্টির জন্য মধু, পিনাট বাটার বা চটকানো কলা ব্যবহার করে মিশ্রণটি ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বেক করে বা ফ্রিজে জমিয়ে নেওয়া যায়। ওটস রক্তচাপ এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে, আর কাঠবাদামে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বি হার্ট ভালো রাখে। অধ্যাপক সারাহ বেরি পরামর্শ দেন যে খাদ্যতালিকা থেকে সব অস্বাস্থ্যকর খাবার একেবারে বাদ দেওয়ার চেয়ে বেশি করে স্বাস্থ্যকর খাবার যোগ করার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। এতে স্বাভাবিকভাবেই অস্বাস্থ্যকর খাবারের জায়গা কমে আসবে।
