মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক মার্কিন-ইরান চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে দাবি করেছেন, যা আল জাজিরা এবং রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি জানান যে আগামী সপ্তাহের শেষভাগে ইউরোপে এই সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। তার এই ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সাথে আলোচনা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং সবাই এতে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে ট্রাম্প ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে ভয়াবহ সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। এই দ্বীপটি দিয়ে ইরানের মোট অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশ রপ্তানি করা হয়ে থাকে এবং এর অবস্থান মার্কিন সামরিক ঘাঁটির খুব কাছে। হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতির পর ট্রাম্প আকস্মিকভাবে তা বাতিল করেন এবং দাবি করেন যে তেহরানের সাথে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে গত তিন মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধের অবসান ঘটবে বলে ওয়াশিংটন আশা প্রকাশ করছে। হোয়াইট হাউসের তথ্যমতে মার্কিন উপ-রাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন যিনি গত এপ্রিল মাসে প্রথম যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরু করেছিলেন।
তেহরান অবশ্য ট্রাম্পের এই ড়িঘড়ি দাবিকে জল্পনা বলে অভিহিত করেছে এবং চূড়ান্ত কোনো চুক্তির বিষয়টি অস্বীকার করেছে। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে মার্কিন-ইরান চুক্তি নিয়ে খসড়া প্রস্তাবটি বিবেচনাধীন রয়েছে তবে ইরান তার নীতিগত অবস্থান থেকে পিছপা হবে না। তিনি উল্লেখ করেন যে আলোচনার বড় অংশ চূড়ান্ত হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে যে গত দুই মাসে ট্রাম্প অন্তত ৩৮ বার এমন আসন্ন চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে তেহরানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না এবং দেশের সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত না করে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি আদৌ আসবে কিনা নাকি এটি একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি মাত্র। অস্ট্রিয়ার সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুসতাই আল জাজিরাকে বলেছেন যে ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া উচিত নয়। এটি মূলত একটি তথ্য যুদ্ধ বা ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ারের অংশ যার লক্ষ্য মার্কিন রাজনৈতিক মহল, আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এবং ইরানের সরকারকে প্রভাবিত করা। গত এপ্রিল মাসে ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই পরোক্ষ আলোচনা চলছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে এই সমঝোতায় ইসরাইল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক এবং পাকিস্তানসহ অঞ্চলের প্রধান দেশগুলোর সমর্থন রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালালে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয় যা আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। ট্রাম্প তার আসন্ন ৮০তম জন্মদিন উদযাপনের প্রস্তুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল বিশ্বকাপ ফিরে আসার ডামাডোলের মধ্যেই এই চুক্তি সম্পন্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ওয়াশিংটন দাবি করছে যে ইরান কোনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সমর্পণ করতে হবে। অন্য দিকে তেহরান তাদের অবরুদ্ধ আন্তর্জাতিক তহবিল অবমুক্ত করার এবং সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই মুহূর্তে কোনো চূড়ান্ত মার্কিন-ইরান চুক্তি না হলেও যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার জন্য একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে।
