মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তি ও শান্তি নগরীর ইতিহাস

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৬, ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম

জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তি ও শান্তি নগরীর ইতিহাস

ছবি : সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চলমান যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বলে আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে, যার ফলে এই ঐতিহাসিক জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তি বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি পাকিস্তান দ্বারা আয়োজিত হবে, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে মধ্যস্থতা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যদিও এই অনুষ্ঠানে দুই যুদ্ধরত পক্ষ এবং মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষে কোন কোন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য এই স্থানটির নির্বাচন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তথাকথিত এই শান্তি নগরী বা জেনেভা দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে AsRef এবং এর আগে এখানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশিষ্ট ফেলো ইয়ান লেসার আল জাজিরাকে জানিয়েছেন যে, সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতা, জাতিসংঘ এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলোর উপস্থিতি এবং জেনেভায় বেশ কিছু উপযুক্ত ও বিচক্ষণ সম্মেলন কেন্দ্রের প্রাপ্যতা এই ধরনের চুক্তি সম্পন্ন করার জন্য একে একটি আদর্শ স্থান হিসেবে গড়ে তুলেছে।

চলতি ২০২৬ সালের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রায় তিন মাস এবং ১৬ দিন ধরে চলা এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি কাঠামোকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন মধ্যস্থতাকারী দলটির অক্লান্ত পরিশ্রমে গত ১৪ জুন রাতে একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা সম্ভব হয়। বর্তমান এই জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তিটি মূলত একটি রূপরেখা চুক্তি হিসেবে কাজ করবে, যার অধীনে উভয় পক্ষ লেবাননসহ সমস্ত ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এই চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উপাদানগুলোর মধ্যে একটি হলো হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ টোল-মুক্তভাবে উন্মুক্ত করা এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিশ্চিত করেছেন যে, গত রবিবার দুই দেশের মধ্যে এই সমঝোতা স্মারকটি ডিজিটালভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং আগামী শুক্রবার জেনেভায় এর আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হবে। তবে আগামী ৬০ দিনের বর্ধিত আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম মজুত এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জেনেভায় অতীতে স্বাক্ষরিত প্রধান শান্তি চুক্তিগুলোর দিকে তাকালে সর্বাগ্রে আসে ঐতিহাসিক জেনেভা কনভেনশন, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। সুইজারল্যান্ডের ব্যবসায়ী হেনরি ডুনান্টের উদ্যোগে এবং ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রসের খসড়া প্রণয়নের মাধ্যমে প্রথম ১৮৬৪ সালের ২২ আগস্ট এই কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা হ্রাস করার লক্ষ্যে ৬৩টি দেশ এই নিয়মগুলোকে আরও বিস্তৃত করে চারটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই কনভেনশনগুলোর প্রথমটি যুদ্ধক্ষেত্রে আহত ও অসুস্থ সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সুরক্ষা প্রদান করে এবং চিকিৎসা ও ধর্মীয় কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করে। দ্বিতীয় কনভেনশনটি সমুদ্রে আহত, অসুস্থ এবং যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের শিকার হওয়া নৌবাহিনীর সদস্যদের সুরক্ষার আহ্বান জানায় এবং হাসপাতাল জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তৃতীয় চুক্তিটি যুদ্ধবন্দিদের সাথে মানবিক আচরণের নীতিমালা নির্ধারণ করে এবং সক্রিয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অবিলম্বে তাদের মুক্তি ও স্বদেশে ফেরত পাঠানোর নীতি প্রতিষ্ঠা করে। চতুর্থ কনভেনশনটি আন্তর্জাতিক এবং অ-আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাগরিকদের জীবন ও মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব প্রদান করে।

জেনেভার কূটনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৯৫৪ সালের জেনেভা চুক্তি, যা প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল। ফ্রান্স এবং ভিয়েতনামের স্বাধীনতাকামী লিগ বা ভিয়েত মিনের মধ্যে ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৫৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের ২০ থেকে ২১ জুলাই সুইজারল্যান্ডের এই শহরে কম্বোডিয়া, লাওস, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রতিনিধিরা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি ইন্দোচীনে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটাতে এবং ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোدیای স্বাধীনতা প্রদানে সহায়তা করলেও সাময়িকভাবে ভিয়েতনামকে ১৭তম সমান্তরাল রেখায় দুটি জোনে বিভক্ত করেছিল। চুক্তিটিতে ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে ভিয়েতনামের পুনরেকত্রীকরণ নির্বাচনের আহ্বান জানানো হলেও পরবর্তীতে তা দীর্ঘস্থায়ী political সংকটের জন্ম দিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনেও জেনেভা একাধিকবার ঐতিহাসিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে, যার একটি অনন্য উদাহরণ হলো ১৯৭৪ সালের ইসরায়েল-সিরিয়া সেনা প্রত্যাহার চুক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১৯৭৪ সালের ৩১ মে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের পর দুই দেশের মধ্যে শত্রুতার অবসান ঘটায়। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে মিসর এবং সিরিয়া যৌথভাবে সিনাই ও গোলান উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করা। এই চুক্তিটিকে একটি আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি হিসেবে বিবেচনা না করা হলেও এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি যা দুই দেশের মধ্যে একটি পৃথকীকরণ অঞ্চল তৈরি করে এবং যুদ্ধবন্দিদের মুক্তির আহ্বান জানায়। শান্তি বজায় রাখার জন্য এই বাফার জোনে জাতিসংঘ ডিসএনগেজমেন্ট অবজারভার ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছিল, যা দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে সরাসরি সংঘাত প্রতিরোধে কাজ করেছে।

পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জেনেভায় মিসর ও ইসরায়েলের মধ্যে সিনাই দ্বিতীয় চুক্তি নামের আরেকটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হয়েছিল। মার্কিন সরকারি আর্কাইভের তথ্য অনুসারে, এই চুক্তিটি ইয়ম কিপুর যুদ্ধের পর একটি ন্যায়ственное এবং টেকসই শান্তির দিকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এই চুক্তির অধীনে ইসরায়েল ও মিসর একে অপরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা সামরিক অবরোধের হুমকি না দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল এবং স্থল, সমুদ্র ও আকাশে যুদ্ধবিরতি কঠোরভাবে মেনে চলার magnetism প্রকাশ করেছিল। এই চুক্তির ফলে ইসরায়েল সিনাই উপত্যকার কৌশলগত পাসগুলো থেকে পিছু হটতে এবং আবু রুদাইস ও রাস সুদার তেলক্ষেত্রগুলো মিসরের কাছে ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়। জাতিসংঘ এখানে একটি বাফার জোন পর্যবেক্ষণ করে এবং সুয়েজ খাল ইসরায়েলের অ-সামরিক পণ্যবাহী জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জেনেভার এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি ১৯৮৮ সালের চুক্তির মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ হয়, যা আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে জাতিসংঘ কর্তৃক ব্রোকার করা হয়েছিল। ১৯৮৮ সালের ১৪ এপ্রিল আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্যারান্টার বা জামিনদার হিসেবে উপস্থিত ছিল। এই চুক্তিগুলোর ফলে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত হয় এবং যুদ্ধের সময় পালিয়ে যাওয়া আফগান refugees দের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম হয়। এরপর ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া এবং সাবেক যুগোস্লাভিয়া ক্রোয়েশিয়ান স্বাধীনতা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ভ্যান্স প্ল্যান নামের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইরাস ভ্যান্সের আলোচনায় জেনেভায় সম্পন্ন হয়েছিল। এই চুক্তি শত্রুতার তাত্ক্ষণিক অবসান এবং ক্রোয়েশিয়া থেকে যুগোস্লাভ সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়।

সবশেষে ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের জন্য একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করা হয়েছিল, যা জেনেভা ইনিশিয়েティブ নামে পরিচিত। সুইজারল্যান্ড সরকারের সহায়তায় ২০০৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের দ্বারা এই প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করা হয় এবং ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। এই শান্তি পরিকল্পনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের অধিকার ত্যাগ করা, জেরুজালেমকে বিভক্ত করে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের আল-আকসা মসজিদের সাইটের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া এবং ইহুদিদের আল-বুরাক দেয়ালের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া। এটি জেরুজালেমকে উভয় দেশের রাজধানী করার এবং ১৯৬৭ সালের পর নির্মিত অধিকাংশ ইহুদি বসতি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছিল। তবে এই ঐতিহাসিক উদ্যোগটি ইসরায়েল বা ফিলিস্তিন কোনো দেশের সরকার দ্বারাই আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি, যা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। বর্তমান এই জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তিটির ক্ষেত্রেও পারমাণবিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং ইসরায়েল এই আলোচনায় অংশ না নেওয়ায় লেবানন ফ্রন্টের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

banner
Link copied!