লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালীতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিতে গঠিত ১৪টি দেশের নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের কমান্ডার হিসেবে রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরিকে নিয়োগ দিয়েছে সৌদি আরব, বৃহস্পতিবার আল জাজিরা এবং সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এক যৌথ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথগুলো যখন ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মুখে পড়েছে, ঠিক তখনই এই সামরিক নিয়োগের ঘোষণা দিল রিয়াদ। কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথগুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত জুলাই মাসের ৩০ তারিখে এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে এই বিশেষ বহুজাতিক নৌ জোট প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, মিসর, জর্ডান, পাকিস্তান, তুরস্ক, সুদান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, জিবুতি এবং কমোরোস। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব বিবৃতিতে জানিয়েছে, নতুন নিযুক্ত কমান্ডার হিসেবে আল-শেহরি জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সামরিক সমন্বয় সাধন করবেন। একই সঙ্গে তিনি অন্যান্য আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক জোটের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবেন এবং নৌ নিরাপত্তার স্বার্থে চুক্তির আওতায় থাকা যৌথ অভিযানগুলো সরাসরি পরিচালনা করবেন।
নতুন এই সামুদ্রিক উদ্যোগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চূড়ান্ত করতে এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে আগামী ১২ থেকে ১৩ আগস্ট একটি বিশেষ উচ্চ পর্যায়ের পরিকল্পনা সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সৌদি মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি মূলত একটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জোট এবং এর মূল লক্ষ্য ও নীতির সঙ্গে একমত পোষণকারী যেকোনো স্বাধীন দেশ এতে নির্দ্বিধায় যোগ দিতে পারে। তারা আরও জানিয়েছে যে, ইতিমধ্যে বিশ্বের আরও বেশ কয়েকটি দেশ এই জোটে যোগদানের সকল আইনি প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে। এমনকি কিছু দেশ আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ গ্রহণের আগেই প্রাথমিক যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল সামুদ্রিক জোট ঠিক এমন এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক সময়ে গঠিত হলো যখন ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ হরমুজ প্রণালীতে অত্যন্ত চরম আকার ধারণ করেছে। সামরিক সংঘাতের কারণে ওই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি এখন কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ কেবল এই একটি পথ দিয়েই নিয়মিত পরিবাহিত হতো।
এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্য পথটি দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তেলের বাজারে সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক দেশ সরাসরি অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, চলমান এই তীব্র সামরিক সংঘাতের মাঝে সদ্য গঠিত নতুন এই নৌ জোট বাস্তবে ঠিক কতটা কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বহুজাতিক এই বিশাল ঐক্যবদ্ধ সামরিক প্রয়াস অন্ততপক্ষে লোহিত সাগর অঞ্চলে বাণিজ্য জাহাজগুলোর ওপর হামলার ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে।
