হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার জবাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী শুক্রবার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার ঘাঁটিতে শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে বলে রয়টার্স এবং বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে সিঙ্গাপুরের পতাকাবেষ্টিত এমভি এভার লাভলি নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে বৃহস্পতিবার ইরানের চালানো ৪টি আত্মঘাতী ড্রোনের মধ্যে ১টি আঘাত হানার পর এই পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ওই ঘটনার পর পারস্য উপসাগর থেকে শত শত অবরুদ্ধ জাহাজ সরিয়ে নেওয়ার জন্য জাতিসংঘ সমর্থিত আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ড্রোন হামলাকে দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি নির্বোধের মতো লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চুক্তি এখনো কার্যকর আছে কি না সে বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ওমান উপকূলের কাছে ওমানি জলসীমা ঘেঁষে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজের উপর এই হামলা আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের স্বাধীনতার চরম পরিপন্থী। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল আরসেনিও ডমিঙ্গেজ জানিয়েছেন, ওই অঞ্চলে এখনো প্রায় ৫০০টি জাহাজ আটকা পড়ে আছে এবং নিরাপত্তার গ্যারান্টি না পাওয়া পর্যন্ত উদ্ধার কাজ শুরু হবে না।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এক বিবৃতিতে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে চুক্তিভঙ্গকারী মার্কিন শাসনব্যবস্থাকে দায়ী করেছে। আইআরজিসি দাবি করেছে যে, ওই বাণিজ্যিক জাহাজটি পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অতিক্রম করার সময় একটি অননুমোদিত রুট বা পথ ব্যবহার করায় তাদের নৌবাহিনী সেটি প্রতিরোধ করতে বাধ্য হয়। তেহরানের সংসদীয় কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন যে, হরমুজ প্রণালী ইরান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এটি কোনো যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন নয় বরং চুক্তি ব্যবস্থাপনা মাত্র। তবে আইআরজিসি আরও জানিয়েছে যে, মার্কিন হামলার জবাবে তারা এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর উপর্যুপরি হামলার পর তেহরান কৌশলগতভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ করে দিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এবং সারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। এই সংকট নিরসনে গত ১৭ জুনে উভয় পক্ষ একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে শত্রুতা অবসান এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়ে একমত হয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সপ্তাহে উপসাগরীয় দেশগুলো সফর শেষ করে বলেছেন যে, ইরান যদি মুক্ত ও শর্তহীন জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে তবে নতুন করে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে।
যুক্তართველოს ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় সতর্ক করে বলেছেন যে, যদি ইরানের সমঝোতা স্মারক নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকে তবে তারা আলোচনার টেবিলে আসতে পারত কিন্তু সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়েই দেওয়া হবে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ عبدالله বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির প্রতি পূর্ণ অঙ্গীকার বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বর্তমানে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর ও নাজুক অবস্থায় রয়েছে এবং যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নতুন পাল্টা সামরিক সংঘাত দুই দেশের স্থায়ী শান্তির আলোচনাকে শেষ পর্যন্ত কতটা গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
