বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার সভাপতি পদে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর টিকে থাকা এখন আর গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপের পেশাদার ফুটবল লিগগুলোর শীর্ষ প্রধান। বিশ্বকাপ ফুটবলের বাণিজ্যিক অধিকার বিক্রির একটি বিতর্কিত ও গোপন পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে বাতিল করতে বাধ্য হওয়ার পর এই কঠোর অবস্থান সামনে এসেছে। রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে ইউরোপীয় লিগগুলোর সভাপতি ক্লাউডিয়াস শেফার এই মন্তব্য করেছেন।
ক্লাউডিয়াস শেফার এমন একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যা মহাদেশটির তিরিশটিরও বেশি পেশাদার পুরুষ ও নারী ফুটবল লিগকে প্রতিনিধিত্ব করে। গত রোববার সুইজারল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র সন্ট্যাগস সাইটুংকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে এই পুরো ঘটনার পর ইনফান্তিনোর পদ নিয়ে প্রশ্ন তোলার উপযুক্ত সময় এসেছে। তার মতে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান যখন নিয়মনীতি ও মূল সংস্থাকে অন্ধকারে রেখে এমন একটি স্পর্শকাতর ও দূরবর্তী বাণিজ্যিক চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তখন তার পরিণতি কী হওয়া উচিত তা পরিষ্কার।
এর আগে গত শুক্রবার ফিফা জানায় যে ব্যাপক বিরোধিতার মুখে তারা ওই বাণিজ্যিক পরিকল্পনাটি থেকে সম্পূর্ণ পিছিয়ে আসছে এবং প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। এর পরপরই ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তথা উয়েফা এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা অঞ্চলের সংস্থা কনকাকাফ জানায় যে ফিফা সভাপতির নেতৃত্বের ওপর তাদের আর কোনো আস্থা অবশিষ্ট নেই। মহাদেশীয় এই প্রভাবশালী সংস্থাগুলোর এমন অবস্থান বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক প্রশাসনিক সংকটের জন্ম দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সুইশ ফুটবল লিগের প্রধান নির্বাহী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা ক্লাউডিয়াস শেফার আরও বলেন যে ফিফার এই প্রস্তাবের পেছনের মূল উদ্দেশ্য ছিল তৃতীয় পক্ষের মুনাফা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। ভবিষ্যতে আরও বড় এবং বেশি সংখ্যক টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ফায়দা লোটার পক্ষেই মূলত কাজ করছিল ফিফা প্রশাসন। তার মতে এই পুরো প্রক্রিয়ায় কেবল আর্থিক লাভের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং অন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
ইউরোপীয় পেশাদার লিগগুলো এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেছে কারণ এর ফলে আন্তর্জাতিক ম্যাচ ক্যালেন্ডার আরও বেশি ভারী হয়ে উঠবে। এমনিতেই খেলোয়াড়দের ওপর অতিরিক্ত ম্যাচের চাপ রয়েছে এবং নতুন কোনো প্রতিযোগিতা যুক্ত হলে তা জাতীয় লিগগুলোর অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। শেফার স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে এই ধরনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে ফিফার নিজস্ব গভর্নিং বডি বা কাউন্সিলে কোনো আলোচনাই করা হয়নি। সভাপতি একা এককভাবে এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং অগ্রহণযোগ্য।
ফুটবল প্রশাসনের নীতিমালার বাইরে গিয়ে একক সিদ্ধান্তে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া সংগঠকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আগামী দিনে ফিফা প্রশাসনের ভেতরে এবং বাইরে এই সংকটের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রয়টার্সের তথ্যমতে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ক্ষোভ দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কী ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে নেওয়া হবে এবং এই সংকটের ধাক্কা কীভাবে সামাল দেবে বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তা নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মহলে এই ঘটনা এক গভীর বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অতীতেও ফিফার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও বর্তমানের এই নজিরবিহীন বিরোধিতায় সভাপতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় অ্যাসোসিয়েশন এবং ক্লাবগুলো এখন ঐক্যবদ্ধভাবে ফুটবলের স্বার্থ রক্ষায় সোচ্চার হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য সামনে আসার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।
