জাপানের রাজধানী টোকিওর গিনজা এলাকায় অবস্থিত ১৬৩ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বাথহাউস বা গণগোসলখানা ‘কোনপারু-ইউ’ কিভাবে জাপানি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছে তা নিয়ে মঙ্গলবার বিবিসি ট্রাভেল একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন এবং বিশ্বখ্যাত বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের শোরুমের ভিড়ে লুকিয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি জাপানের প্রাচীন সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল হিসেবে টিকে রয়েছে। প্রতিদিন শত শত স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিদেশি পর্যটক টোকিওর এই ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকায় এসে নিজেদের ক্লান্তি দূর করতে এই ঐতিহাসিক বাথহাউসে জড়ো হন। বর্তমান যুগের তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ যান্ত্রিক জীবনযাত্রার মাঝেও এই গণগোসলখানাটি মানুষকে শত শত বছর আগের শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশের স্বাদ উপহার দিয়ে চলেছে। টোকিওর হৃদপিণ্ডে অবস্থিত এই বাথহাউসটি কেবল শরীর পরিষ্কারের স্থান নয়, বরং এটি জাপানিদের পারস্পরিক সামাজিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা।
জাপানে এই ধরনের গণগোসলখানাকে স্থানীয় ভাষায় ‘সেনতো’ বলা হয় যার ইতিহাস প্রায় বারোশত বছর পুরনো। অষ্টম শতাব্দীতে জাপানে বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারের সময় এই ঐতিহ্যের সূত্রপাত হয়েছিল যখন শরীর ও আত্মাকে পবিত্র করা বুদ্ধের সেবার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরবর্তীতে সপ্তদশ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী এদো যুগে এই বাথহাউসগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে এবং পুরো জাপানজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন সময়ে বেশিরভাগ সাধারণ নাগরিকের বাড়িতে নিজস্ব কোনো গোসলখানা বা বাথটাব না থাকায় তারা অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে স্থানীয় এই সেনতোগুলোতে আসতেন। ইতিহাসবিদদের মতে এই স্থানগুলো জাপানি সমাজব্যবস্থার শ্রেণিবৈষম্য দূর করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
প্রাচীন এদো যুগে যখন জাপানি সমাজ কঠোরভাবে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল, তখন এই বাথহাউসগুলো ছিল এমন এক বিরল উন্মুক্ত স্থান যেখানে সামুরাই যোদ্ধা, ব্যবসায়ী এবং দিনমজুররা একসাথে গোসল করতে পারতেন। বাথহাউস সংস্কৃতির গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, অভিজাত সামুরাই যোদ্ধারাও গোসলখানায় প্রবেশের আগে তাদের অহংকার ও ক্ষমতার প্রতীক তথা তরবারি বাইরে রেখে আসতেন। গরম পানির এই চৌবাচ্চায় নামার পর সামাজিক পদমর্যাদা, পোশাকের জাঁকজমক বা আভিজাত্যের কোনো অস্তিত্ব থাকত না এবং সবাই কেবল একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে একে অপরের মুখোমুখি হতেন। শত শত বছর পর আজ আধুনিক টোকিওর চরম ব্যস্ত ও বৈষম্যমূলক পরিবেশের মধ্যেও কোনপারু-ইউ বাথহাউসে এই প্রাচীন সাম্যবাদের ধারণাটি টিকে রয়েছে যাকে জাপানিরা ‘হাদাকা নো সুকিআই’ বা ‘নগ্ন বন্ধুত্ব’ বলে অভিহিত করে থাকে। এখানে প্রবেশের পর মানুষের দামি ঘড়ি, পোশাক বা বেতনের হিসাব লকারেই বন্দি হয়ে যায় এবং সবাই সমান হয়ে শান্ত জলে সময় কাটায়।
বিলাসবহুল গিনজা শপিং ডিস্ট্রিক্টের আধুনিক কাচ ও স্টিলের তৈরি বহুতল ভবনগুলোর মাঝে কোনপারু-ইউ বাথহাউসটিকে খুঁজে পাওয়া প্রথমবার আগত যেকোনো দর্শনার্থীর জন্য বেশ কঠিন হতে পারে। একটি সরু গলির শেষ প্রান্তে ঐতিহ্যবাহী লণ্ঠন এবং নীল রঙের পর্দা দিয়ে ঢাকা এই গোসলখানার প্রবেশদ্বারটি অত্যন্ত সাধারণ ও নিরহংকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। আঠারোশত তেষট্টি সালে প্রতিষ্ঠিত এই বাথহাউসটি ১৯৫৭ সালে কিছুটা সংস্কার করা হয় এবং এটিকে একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় স্থানান্তর করা হলেও এর ভেতরের প্রাচীন সাজসজ্জা ও ঐতিহ্য সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। বাথহাউসের ভেতরে প্রবেশ করলেই দর্শনার্থীরা কাঠের তৈরি পুরনো দিনের লকার, ঐতিহ্যবাহী কাঠের ছাদ এবং প্রবেশদ্বারের কাউন্টার দেখতে পান যা তাদের মুহূর্তের মধ্যেই কয়েক শতাব্দী আগের প্রাচীন টোকিওতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই বাথহাউসটির নামকরণ করা হয়েছে জাপানের প্রাচীন নাট্যকলা ‘নোহ’ এর এক বিখ্যাত ঘরানার শিল্পীদের বাসস্থানের নামানুসারে।
কোনপারু-ইউ বাথহাউসের অভ্যন্তরে রয়েছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন টাইলসের তৈরি চিত্রকর্ম যা এর সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই গোসলখানার দেয়ালে জাপানের পবিত্র পর্বত মাউন্ট ফুজি-র এক বিশাল ছবি আঁকা রয়েছে যা জাপানের বিখ্যাত সেনতো শিল্পী মোরিও নাকাজিমার তুলির আঁচড়ে তৈরি। পুরুষদের গোসলখানার অংশে মাউন্ট ফুজিকে লাল রঙে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো দেখায় এবং নারীদের অংশে এটিকে শান্ত নীল রঙে চিত্রিত করা হয়েছে। এই বিশাল মাউন্ট ফুজি চিত্রের পাশাপাশি দেয়ালে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বারোটি রঙিন কার্প মাছ, ঋতুভিত্তিক ফুল এবং বিভিন্ন পাখির ছবি আঁকা রয়েছে যা প্রাচীন জাপানি কুতানি চিনা মাটির টাইলসের এক অনন্য শিল্পকর্ম। গরম পানির চৌবাচ্চায় শরীর ডুবিয়ে এই চমৎকার শিল্পকর্মগুলো উপভোগ করা দর্শনার্থীদের জন্য এক পরম মানসিক শান্তি ও প্রশান্তি বয়ে আনে।
এই ঐতিহাসিক বাথহাউসে গোসল করার ক্ষেত্রে জাপানিদের হাজার বছরের পুরনো কিছু কঠোর নিয়ম ও শিষ্টাচার মেনে চলতে হয় যা দেশি-বিদেশি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। গোসলখানায় প্রবেশের পূর্বে প্রত্যেক দর্শনার্থীকে প্রথমে তাদের জুতো ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কাঠের লকারে রাখতে হয় এবং এরপর সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে মূল কক্ষে প্রবেশ করতে হয়। মূল চৌবাচ্চায় নামার আগে প্রতিটি মানুষকে বাইরে বসে সাবান ও ঠান্ডা-গরম পানি দিয়ে নিজের শরীর খুব ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হয় যাতে ভেতরের পানি কোনোভাবেই দূষিত না হয়। লম্বা চুল সবসময় ওপরের দিকে বেঁধে রাখতে হয়, কোনো পোশাক বা তোয়ালে পানির ভেতরে নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং চৌবাচ্চায় বসার পর অত্যন্ত নিচু স্বরে কথা বলতে হয় অথবা সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করতে হয়। এই অলিখিত সামাজিক নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার মাধ্যমেই জাপানিরা তাদের গোসলখানার শান্ত ও পবিত্র পরিবেশ বজায় রাখে যা তাদের জাতীয় শৃঙ্খলারই একটি অংশ।
টোকিওর এই বিখ্যাত বাথহাউসের পানি প্রতিদিন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিয়াল্লিশ থেকে তেতাল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বজায় রাখা হয় যা মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি এবং ক্লান্তি দূর করতে অত্যন্ত কার্যকরী। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার এবং প্রতিটি বাড়িতে উন্নত বাথটাব তৈরি হওয়ার কারণে জাপানজুড়ে ঐতিহ্যবাহী এই সেনতোগুলোর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবে কোনপারু-ইউ স্থানীয় জনগণের অকুন্ঠ সমর্থন এবং এর ঐতিহাসিক মূল্যের কারণে শত প্রতিকূলতার মাঝেও আজ পর্যন্ত সগৌরবে টিকে রয়েছে। প্রতি মাসে দুইবার এই বাথহাউসে বিশেষ ‘ফ্লাওয়ার ফ্লোটিং’ বা পুষ্প ভাসমান উৎসবের আয়োজন করা হয় যেখানে গরম পানির ওপর শত শত তাজা ফুল ভাসিয়ে দেওয়া হয় যা দর্শকদের এক চমৎকার সুবাস ও নতুন অভিজ্ঞতা প্রদান করে। প্রতিদিন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে অসংখ্য চাকুরিজীবী এবং তরুণ শিল্পীরা এই বাথহাউসে এসে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে তাদের মানসিক চাপ দূর করেন।
যা কম স্পষ্ট তা হলো আধুনিক প্রজন্মের যান্ত্রিক ও দ্রুতগতির জীবনযাত্রার মাঝে এই ধরনের প্রাচীন বাথহাউসগুলো আরও কত বছর তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে। যদিও বিশ্বজুড়ে জাপানি সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এখানে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা অনেক বেড়েছে, তবুও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবলের অভাব এই ঐতিহ্যবাহী খাতের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে চলাই এখনকার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত যাতে বহিরাগত দর্শনার্থীরা এসে স্থানীয় পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করেন। টোকিওর এই লুকানো বাথহাউসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যান্ত্রিক সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছেও মানুষ কিভাবে তার প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মানবিক সাম্যবোধকে পরম যত্নে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। এই শহরের আকাশচুম্বী বহুতল ভবনের আলো ঝলমলে রূপের আড়ালে কোনপারু-ইউ বাথহাউসটি তাই হয়ে উঠেছে প্রকৃত টোকিওকে চেনার এবং অনুভব করার এক অনন্য মাধ্যম।
