সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পিএসজির জয়ের পর ফ্রান্সে ফুটবল সহিংসতা, গ্রেপ্তার ৪১৬

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩১, ২০২৬, ১২:০১ পিএম

পিএসজির জয়ের পর ফ্রান্সে ফুটবল সহিংসতা, গ্রেপ্তার ৪১৬

প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের আনন্দ উদযাপনকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে ফুটবল সহিংসতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। আর্সেনালকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ফরাসি ক্লাবটির টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপ সেরার মুকুট অর্জনের পর দেশটির বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সমর্থকদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় হাজার হাজার দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা ছড়ানোর দায়ে রবিবার ভোররাত পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ৪১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ফরাসি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে জড়ো হওয়া মারমুখী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে ব্যাপক মাত্রায় কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।

খেলার শেষ বাঁশি বাজার পরপরই ঐতিহাসিক শঁজেলিজের রাস্তাগুলোতে হাজার হাজার পিএসজি সমর্থক জড়ো হতে শুরু করেন এবং মুহূর্তের মধ্যে উৎসবের পরিবেশ দাঙ্গায় রূপ নেয়। উদযাপনের নামে শত শত সমর্থক ফ্লেয়ার এবং আতশবাজি ফুটিয়ে রাস্তায় তাণ্ডব চালায়। ফরাসি পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্যারিসের রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাইক পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং উত্তেজিত জনতা অন্তত একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাঁচের সম্মুখভাগ ভেঙে চুরমার করেছে। এর আগে পার্ক দে প্রাঁস স্টেডিয়ামের বাইরে বড় পর্দায় খেলা দেখার জন্য জড়ো হওয়া সমর্থকদের একাংশের সঙ্গেও পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে। 

এই সহিংসতায় অন্তত ছয়টি যানবাহন, দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং একটি বাস কাউন্টার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎসবরত জনতার একাংশ যখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিল, তখন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল থমকে দাঁড়ায়। মেট্রো স্টেশনগুলোর প্রবেশ পথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনীকে কাঁদানে গ্যাসের পাশাপাশি জলকামান ব্যবহারের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেস এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতাকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে সংঘর্ষের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত সাতজন পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া ৪১৬ জনের মধ্যে শুধু প্যারিস শহর থেকেই ২৮০ জনকে আটক করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী political নেতা মারিন ল্য পেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিবৃতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন যে, কেবল ফ্রান্সেই একটি ফুটবল ক্লাবের জয় দাঙ্গার জন্ম দেয় এবং সাধারণ মানুষকে সহিংসতা এড়াতে ঘরে বন্দি থাকতে হয়।

ইউরোপীয় ফুটবলের এই সর্বোচ্চ আসরে ফরাসি ক্লাবের সাফল্যের পর এমন ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও পিএসজির ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর দেশজুড়ে একই ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, যা পরবর্তীতে প্রাণঘাতী রূপ নেয়। গত বছরের সেই ফুটবল দাঙ্গায় একজন ১৭ বছর বয়সী কিশোরসহ অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এবার ফরাসি প্রশাসন আগে থেকেই হাজার হাজার অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও তা মাঠপর্যায়ের সহিংসতা ঠেকাতে পুরোপুরি সফল হয়নি। 

খেলা শেষে প্যারিসের গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশেষ করে বাস এবং ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। মধ্যরাতের পর প্যারিসের প্রধান প্রধান সড়কগুলো কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। খেলাধুলার বড় জয়গুলো কীভাবে বারবার নাগরিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে, তা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক সমাজেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

এই তীব্র উত্তেজনা ও সহিংসতার আবহেই রবিবার বিকেলে প্যারিসের চ্যাম্প দে মার্সে আইফেল টাওয়ারের পাদদেশে পিএসজি খেলোয়াড়দের বর্ণাঢ্য বিজয় প্যারেড অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ক্লাবটির কর্মকর্তাদের জন্য ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ কর্তৃক একটি বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করার সূচি নির্ধারিত রয়েছে। ফরাসি ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবলকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে ফুটবল সহিংসতা যেভাবে একটি নিয়মিত সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে, তা দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা ও উৎসবের সংস্কৃতিকে বড় ধরনের ঝুঁких মুখে ফেলে দিয়েছে।

banner
Link copied!