আমেরিকার সঙ্গে যেকোনো ধরনের দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তিতে যাওয়ার আগে ইরানের জনগণের অধিকার ও বাস্তবসম্মত নিশ্চয়তা অর্জনের বিষয়ে কড়া শর্তারোপ করেছে তেহরান। সম্প্রতি স্পিকার হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর ইরানের পার্লামেন্টের এক ভার্চুয়াল অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে এই কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ পরমাণু আলোচক ও স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মার্কিন প্রশাসনের কোনো ধরনের মৌখিক আশ্বাস বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর তেহরানের কোনো আস্থা নেই। দৃশ্যমান এবং বাস্তব অগ্রগতি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইরান কোনো ধরনের সমঝোতায় স্বাক্ষর করবে না বলে তিনি মার্কিন প্রশাসনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, প্রতিপক্ষের কথার ওপর নির্ভর করে তেহরান নিজের কোনো কৌশলগত প্রতিশ্রুতি আগে বাস্তবায়ন করবে না, বরং প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চাইবে। ইরানের জনগণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত না হলে যেকোনো চুক্তিই তেহরানের কাছে মূল্যহীন বলে গণ্য হবে। diplomatic বা কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার দিকেই ইরান এখন বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
এর আগে গত ২৫ মে ২০২৬ তারিখে ইরানের মজলিস বা জাতীয় সংসদের বার্ষিক নির্বাচনে বিপুল ভোটে পুনরায় স্পিকার নির্বাচিত হন গালিবাফ। নতুন মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই মার্কিন প্রশাসনের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক এবং সবচেয়ে জোরালো কূটনৈতিক বার্তা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গালিবাফের এই কঠোর মন্তব্য মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক নতুন প্রস্তাবের সরাসরি প্রতিক্রিয়া। নিউইয়র্ক টাইমস এবং এক্সিওসের বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, হোয়াইট হাউস থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর আরও কঠোর ও একতরফা শর্ত চাপিয়ে একটি নতুন খসড়া প্রস্তাব তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
আমেরিকার এই নতুন ও কঠিন প্রস্তাবকে তেহরান সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং স্পষ্ট করেছে যে তারা কোনো চাপ বা হুমকির মুখে আত্মসমর্পণ করবে না। গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এক পোস্টে কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন যে, ইরান আলোচনার টেবিলে কোনো ছাড় বা অনুকম্পা আশা করে না, বরং নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির মাধ্যমেই তারা প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে সঠিক আচরণ করতে বাধ্য করবে। তিনি মনে করেন যে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়কে political বা রাজনৈতিক ও আইনি সাফল্যে রূপান্তর করা। এই অনড় মনোভাবের কারণে দীর্ঘদিনের ফ্রট ও জটিল মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা এক নতুন অচলাবস্থার মুখে পড়েছে।
এদিকে ওমান সংলগ্ন কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি আরও জোরদার করেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই শান্তি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও নিরাপত্তার বিষয়টি এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল মনে করছে যে, ওয়াশিংটন যদি ইরানের অবরুদ্ধ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সম্পদ মুক্ত না করে এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটা সম্ভব নয়। গালিবাফের এই নতুন আলটিমেটাম ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এই নতুন অচলাবস্থার প্রভাব শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, बल्कि এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন করে প্রভাবিত করছে। লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রসর এবং হিজবুল্লাহর ওপর ক্রমবর্ধমান হামলার প্রেক্ষিতে তেহরানের এই অনড় নীতি তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখার একটি বড় কৌশল। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের সুবিধাভিত্তিক এবং একতরফা শর্ত চাপানোর নীতি পরিবর্তন না করে, তবে এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
