সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

নেতানিয়াহুর পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল তেল আবিব, মহাসড়ক অবরোধ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩১, ২০২৬, ১০:০৩ পিএম

নেতানিয়াহুর পদত্যাগ দাবিতে উত্তাল তেল আবিব, মহাসড়ক অবরোধ

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পদত্যাগ এবং দেশে দ্রুত আগাম সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে রাজধানী তেল আবিব সহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে রাজপথে নেমে এসেছেন হাজার হাজার ক্ষুব্ধ ইসরায়েলি নাগরিক। শনিবার রাতে আয়োজিত এই বিক্ষোভ কর্মসূচিটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ এবং সুসংগঠিত সরকারবিরোধী গণপ্রতিরোধ হিসেবে রূপ নিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে। দেশটির বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, বিরোধী দলীয় নেতা, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং একাধিক সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই বিক্ষোভে সরাসরি অংশ নিয়ে সরকারের চরম ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেন। বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে বর্তমান প্রশাসনের ভুল যুদ্ধনীতি, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার কারণে দেশ এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে, যা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো বর্তমান সরকারের অবিলম্বে পতন।

বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল তেল আবিবের অত্যন্ত ব্যস্ততম কাপলান স্ট্রিট, যেখানে হাজার হাজার মানুষ প্ল্যাকার্ড ও জাতীয় পতাকা হাতে সমবেত হন। মিছিলটি পরবর্তীতে শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে ঐতিহাসিক থিয়েটার স্কয়ার এবং হাবিমা স্কয়ারে গিয়ে এক বিশাল মহাসমাবেশে পরিণত হয়। সেখানে উপস্থিত জনতা সম্মিলিত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পদত্যাগ এবং যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার দাবিতে অনবরত স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে উত্তেজিত বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশ তেল আবিবের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত কৌশলগত আয়ালন মহাসড়ক পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে ফেলে, যার ফলে পুরো শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। সড়ক সচল করতে দাঙ্গা পুলিশ লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে এবং ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজন সক্রিয় আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়।

আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশের মধ্যে ছিলেন 2023 সালের 7 অক্টোবরের হামলায় নিহতদের পরিবার এবং গাজায় জিম্মি থাকা ইসরায়েলি নাগরিকদের স্বজনরা। তারা অভিযোগ করেছেন যে তৎকালীন সময়ে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিভাগের চরম গাফিলতির কারণেই ওই ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যা জেনেশুনে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং যার সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে বর্তমান সরকার পুরোপুরি ভয় পাচ্ছে। তারা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দায়িত্ব এড়ানোর এবং নিজেদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলেন। বিক্ষোভকারীদের মতে, গাজা উপত্যকায় চলমান সামরিক অভিযানের কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য বা রাজনৈতিক কৌশল নেই, যার ফলে প্রতিদিন সাধারণ ইসরায়েলি সৈনিকদের প্রাণহানি ঘটছে এবং জিম্মিদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চিরতরে ব্যাহত হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক খাতগুলো স্থবির হয়ে পড়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে।

দেশের অভ্যন্তরে যখন এই political বা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তীব্র গণবিক্ষোভ চলছে, ঠিক তখনই ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে লেবানন ফ্রন্ট থেকে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হুমকি তৈরি হয়েছে। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও বসতি লক্ষ্য করে একের পর এক শক্তিশালী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এই আকস্মিক রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পুরো অঞ্চলে এক যুদ্ধকালীন জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং ইসরায়েল হোম ফ্রন্ট কমান্ডের পক্ষ থেকে নতুন করে কঠোর নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সামরিক সংস্থাটি এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে নাগরিকদের সুরক্ষায় এবং সম্ভাব্য ড্রোন অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আরও কঠোর ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। উত্তর অঞ্চলের হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ইসরায়েলি নাগরিকরা সরকারের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে তারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারছেন না।

একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েলি পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সম্মুখ সমরের তীব্রতা বা সংঘর্ষের গভীরতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। হিজবুল্লাহর সামরিক উইং দাবি করেছে যে, তারা দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগত পাহাড়ি এলাকাগুলোতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করা ইসরায়েলি ট্যাংক ও সাঁজোয়া বহরের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের বেশ কিছু সামরিক যান ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। উত্তর সীমান্তের এই অস্থিতিশীল যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তেল আবিবের অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট সরকারকে এক নজিরবিহীন দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল মনে করছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হওয়া এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধক্ষেত্রের এই ক্রমাগত অচলাবস্থা ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের খুব দ্রুত একটি বড় ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে, যা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিতে পারে।

banner
Link copied!