যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের একটি কাগজ উৎপাদনকারী কারখানায় ভয়াবহ রাসায়নিক ট্যাংক বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, গত কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ থাকা বাকি নয়জন শ্রমিকের মরদেহ দুর্ঘটনাস্থলের ভারী ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার একটি কারখানায় ‘হোয়াইট লিকার’ নামের বিষাক্ত রাসায়নিক ভর্তি একটি বিশাল ট্যাংক ধসে পড়ার (ইমপ্লোশন) পর প্রাথমিকভাবে দুইজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এবং বিবিসি নিউজের বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের উপপ্রধান কার্ট স্টিচ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সপ্তাহজুড়ে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দুর্ঘটনাকবলিত কারখানার ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি অভিযান চালায়। উদ্ধারকাজের সুবিধার্থে এবং পুরো শিল্প এলাকাটি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এই ড্রোনের মাধ্যমে ধ্বংসাবশেষের ভেতরের বিপজ্জনক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নয়টি মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। আকস্মিক এই বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কারখানার মূল কাঠামোর একটি বড় অংশ ধসে পড়ে, যা উদ্ধারকাজে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত ওই বিশাল ট্যাংকটিতে প্রায় ৯ লাখ গ্যালন বা ৩৪ লাখ লিটার তরল রাসায়নিক সংরক্ষিত ছিল। স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বিস্ফোরণের পর এই ক্ষতিকারক রাসায়নিকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পাশের ঐতিহাসিক কলাম্বিয়া নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে। হোয়াইট লিকার মূলত কাগজের পাল্প বা মণ্ড তৈরিতে ব্যবহৃত সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড এবং সোডিয়াম সালফাইডের একটি অত্যন্ত ক্ষয়কারী মিশ্রণ। তবে পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে যে, এখন পর্যন্ত আশেপাশের বায়ুর গুণগত মান বা লংভিউ শহরের সাধারণ মানুষের পানীয় জলে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনাগ্রস্ত কারখানাটি জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিখ্যাত কাগজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিপ্পন পেপার ডিস্ট্রিবিউশন বা নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিসের মালিকানাধীন। জাপানি এই বহুজাতিক কোম্পানিটি ২০১৬ সালে সিয়াটলভিত্তিক সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান ওয়েইয়্যারহাউসার-এর কাছ থেকে ২২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে এই মণ্ড উৎপাদনকারী কারখানাটি অধিগ্রহণ করেছিল। বর্তমানে তারা এই প্ল্যান্টটি ‘নিপ্পন ডাইনাওয়েভ প্যাকেজিং’ নামে পরিচালনা করে আসছিল। এই শিল্প কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো ধরনের ঘাটতি বা গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে মার্কিন ফেডারেল নিরাপত্তা সংস্থা ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে।
ওয়াশিংটনের লংভিউ শহরের এই শিল্প দুর্ঘটনাটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকার কাগজ উৎপাদন খাতে ঘটে যাওয়া অন্যতম সবচেয়ে বড় রাসায়নিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। কারখানার শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা নিহতদের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, কলাম্বিয়া নদীর পানি প্রতিনিয়ত পরীক্ষা করা হচ্ছে যাতে রাসায়নিক দূষণ পরিবেশের কোনো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করতে না পারে। কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
