আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ এবং এর জের ধরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে এক প্রলয়ঙ্কারী ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদের তীব্র সংকটের কারণে কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মুখে প্রথম দেশ হিসেবে ফিলিপাইন নিজেদের অর্থনীতিতে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে এই আইনি পদক্ষেপ দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যসামগ্রীর ঘাটতি বা আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
এর ফলে ফিলিপাইনের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে সাধারণ জনগণের দফায় দফায় গণবিক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এখানে বড় ভয়ের বিষয় হলো, চলমান এই ইরান যুদ্ধের বিধ্বংসী প্রভাব কেবল অর্থনৈতিক বা সামাজিক পরিমণ্ডলের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতটি অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে ফিলিপাইনের অভ্যন্তরীণ মুসলিম সমাজ, বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ইসলামী স্কলার ও সাধারণ জনগণের মনস্তত্ত্বে এক গভীর মতাদর্শগত ফাটল ধরাতে শুরু করেছে। এই দূরবর্তী যুদ্ধকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ওলামা ও স্কলারদের মধ্যে তৈরি হওয়া তীব্র মেরুকরণ ও পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি এখন ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িক ঐক্যকে এক চরম সুদূরপ্রসারী ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ছায়াযুদ্ধ এবং দুই বিপরীতমুখী শিবিরের উত্থান
চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে যখন এই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ফিলিপাইনের মুসলিম নেটিজেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীব্র ও তাৎক্ষণিক। খুব দ্রুতই বাংসামোরো অঞ্চলের মুসলিম সমাজ প্রধানত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও কট্টর শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম শিবিরটি আমেরিকার সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তাদের বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক সামরিক পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করছে।
এই মতাদর্শের অনুসারী সাধারণ মুসলিমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্টে দাবি করছেন যে, বিগত কয়েক বছর ধরে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্ব মুসলিমের দীর্ঘদিনের আকুল প্রার্থনা অবশেষে ইরানের সামরিক শক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। তারা তেহরানের এই প্রতিরোধ যুদ্ধকে বিশ্বমঞ্চে মুসলমানদের হারিয়ে যাওয়া সম্মান, মর্যাদা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরুজ্জীবিত করার একটি ঐতিহাসিক হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। এই শিবিরের কাছে ইরান কোনো নির্দিষ্ট উপদলীয় শক্তি নয়, বরং তারা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা একমাত্র দৃশ্যমান মুসলিম শক্তি।
অন্যদিকে, সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে দ্বিতীয় শিবিরটি, যারা প্রথম থেকেই ইরানের এই সামরিক ভূমিকার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। এই শিবিরের নেতৃত্ব দেওয়া কট্টরপন্থী স্কলাররা যুক্তি দিচ্ছেন যে, ইরান মূলত একটি শিয়া শাসিত রাষ্ট্র এবং তাদের সমস্ত সামরিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা ঐতিহাসিকভাবেই মূলধারার সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই শিবিরের একজন প্রভাবশালী আলেমের একটি সাম্প্রতিক ধর্মীয় বক্তব্য স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে শিয়ারা হলো ভেতরের বা গোপন শত্রু, আর জায়নবাদীরা হলো সামনের বা দৃশ্যমান শত্রু।
তাদের মতে, ভেতরের শত্রু সবসময় বাইরের শত্রুর চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে থাকে। এই তীব্র মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে বাংসামোরোর ওলামাদের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব এতটাই বেড়ে গেছে যে, তারা এখন আন্তর্জাতিক যেকোনো সংকটকে একটি নিরপেক্ষ রাজনৈতিক চশমায় দেখার পরিবর্তে সংকীর্ণ ধর্মীয় ও উপদলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করছেন। এই অভ্যন্তরীণ ফাটল ফিলিপাইনে মুসলিমদের বিভক্তিকে দিন দিন আরও বেশি স্থায়ী রূপ দিচ্ছে।
গালফ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা ও স্থানীয় পরিচয়ের সংকট
বাংসামোরোর ইসলামী স্কলারদের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে এমন গভীর ফাটল বা মতবিরোধ কিন্তু রাতারাতি তৈরি হয়নি। সমাজ গবেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের তথাকথিত অব্রাহাম অ্যাকর্ডস বা কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এই অঞ্চলে বিভক্তির বীজ রোপিত হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের একটি রাজনৈতিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে সুদূর ফিলিপাইনের মাটিতে এমন প্রকাশ্য ধর্মীয় বিভাজন আগে কখনো দেখা যায়নি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফিলিপাইনের মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সবসময়ই এক গভীর ও অবিচল সংহতি বিদ্যমান ছিল।
যুগের পর যুগ ধরে তারা ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে দেশজুড়ে নিয়মিত বড় বড় মিছিল ও সেমিনার আয়োজন করে এসেছেন। কিন্তু আরব দেশগুলোর রাজনৈতিক মেরুকরণের পর, বাংসামোরোর কিছু নির্দিষ্ট স্কলার নজিরবিহীনভাবে প্রচার করতে শুরু করেন যে ফিলিস্তিনের পক্ষে এই গণআন্দোলনগুলো আসলে ইরানের একটি গোপন রাজনৈতিক চক্রান্ত বা প্রোপাগান্ডা। তারা দাবি করেন, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস যেহেতু ইরানের আর্থিক ও সামরিক সহায়তা পায়, তাই তারা মূলত শিয়া শক্তির একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার এবং তাদের পথ সঠিক নয়।
এই মতাদর্শগত সংঘাত আরও চরম রূপ নেয় যখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঐতিহাসিক সামরিক অভিযানের পর ইসরায়েল গাজায় নতুন করে নির্বিচার গণহত্যা শুরু করে। সেই সময় ফিলিপাইনের কিছু আলেম পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যম এবং জায়নবাদী শক্তির প্রচার করা ন্যারেটিভ হুবহু লুফে নেন। তারা ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ঔপনিবেশিক নিপীড়ন ও ভূখণ্ড দখলের ঐতিহাসিক সত্যকে সম্পূর্ণ আড়াল করে ৭ অক্টোবরের ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন আক্রমণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থান স্থানীয় সাধারণ সুন্নি মুসলিমদের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়, যারা সবসময় ফিলিস্তিনের মজলুম ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়ানোকে নিজেদের ঈমানী দায়িত্ব মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল কোনো তাত্ত্বিক বা ধর্মীয় বিতর্ক নয়, বরং এটি হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের এক বিপজ্জনক ও জোরপূর্বক মিশ্রণ। উত্তর-উপনিবেশবাদী যুগে রাজনীতি ও ধর্মের এই ধরনের জটিল সংযোগ অনেক দেশেই দেখা যায়, তবে বাংসামোরোর মতো একটি ভঙ্গুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে এর অভ্যন্তরীণ পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
এই সংকটের গভীরতম কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে যে, বাংসামোরোর যে সমস্ত স্কলার বা আলেম তীব্রভাবে ইরান-বিরোধী এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের সমালোচক, তাদের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট কিছু গালফ বা আরব দেশের স্বৈরাচারী বা রাজতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। পড়াশোনা শেষ করে নিজ দেশে ফিরে আসার পর তারা অজান্তেই সেই সমস্ত আরব দেশের রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক স্বার্থ ও রাজতান্ত্রিক আদর্শকে স্থানীয় মুসলিমদের ধর্মীয় ডিসকোর্সের মধ্যে হুবহু প্রতিস্থাপন করছেন।
এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছেন। ইন্টারনেটে লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার থাকা এই সমস্ত আলেমের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা গভীর জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ তাদের প্রতিটি রাজনৈতিক মন্তব্যকে একটি পবিত্র ধর্মীয় ফতোয়া হিসেবে গ্রহণ করছেন। এটি পবিত্র কুরআনের সেই শাশ্বত জ্ঞানবণ্টনের নীতি বা `আহলুল জিকর` অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার যে ঐশ্বরিক নির্দেশনা রয়েছে, তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
বিগত ১৯৭০-এর দশক থেকে ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলের মুসলিমরা নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন পরিচয়ের জন্য দীর্ঘ রক্তাক্ত সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করে এসেছেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তারা আজ বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর শান্তিকালীন রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই জটিল সময়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের মধ্যে একটি সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের আমদানি করা এই ছায়াযুদ্ধ ও উপদলীয় কোন্দল তাদের সেই ঐক্যবদ্ধ পরিচয় গড়ার প্রক্রিয়াকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। কোনো কোনো স্কলার তো নিজেদের বিপরীত মতাদর্শের ভাইদের সরাসরি `পথভ্রষ্ট` বা বিচ্যুত বলে ফতোয়া দিচ্ছেন, যা স্থানীয় তরুণদের চরমপন্থার দিকে ধাবিত করতে পারে। বাংসামোরোর মুসলিম সমাজকে যদি এই আত্মঘাতী বিভক্তি থেকে রক্ষা পেতে হয়, তবে তাদের এই বিদেশী রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা পরিহার করতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে কাউকে ধর্মীয়ভাবে বয়কট করা ইসলামের উদার নীতির পরিপন্থী। নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে ঐতিহ্য রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই তাদের একটি মানবিক ও ঐক্যবদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে, অন্যথায় এই অভ্যন্তরীণ ফাটল তাদের স্বায়ত্তশাসনকে চিরতরে বিপন্ন করে তুলবে।
