ভারতের অন্যতম বৃহৎ অটোমোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টাটা মোটরস দেশের মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তাদের অত্যন্ত জনপ্রিয় হ্যাচব্যাকモデル ‘টাটা টিয়াগো ফেসলিফ্ট’ সংস্করণটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে ছেড়েছে। নতুন এই আপডেটেড গাড়িটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর সাশ্রয়ী মূল্য এবং চোখ ধাঁধানো অত্যাধুনিক ফিচার্স, যা বর্তমানে বাজারে থাকা অনেক প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির মোটরসাইকেলের দামের সমান। ভারতীয় বাজারে এই নতুন গাড়ির বেস ভ্যারিয়েন্ট তথা ‘টাটা টিয়াগো স্মার্ট পেট্রল ম্যানুয়াল’-এর এক্স-শোরুম প্রারম্ভিক দাম শুরু হয়েছে মাত্র ৪.৬৯ লাখ রুপি থেকে, যা বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট করলে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। বাজেট মূল্যের মধ্যে এমন চমৎকার একটি ফেসলিফ্ট নিয়ে আসায় দক্ষিণ এশিয়ার গাড়ি বাজার এবং সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে ইতিমধ্যে ব্যাপক তোলপাড় ও সাড়া সৃষ্টি হয়েছে।
নতুন ২০২৬ সংস্করণের টাটা টিয়াগো ফেসলিফ্ট গাড়িটির বাহ্যিক নকশায় বেশ কিছু বড় ধরনের ও আকর্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে কোম্পানিটি। আগের তুলনামূলক গোলাকার এবং সাধারণ ডিজাইন থেকে বেরিয়ে এসে এই নতুন মডেলটিতে দেওয়া হয়েছে একটি অত্যন্ত শার্প ও স্পোর্টি অ্যাঙ্গুলার লুক, যা তরুণ ক্রেতাদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করবে। গাড়ির সামনের অংশে যুক্ত করা হয়েছে নতুন ডিজাইনের স্লিক রেক্টাঙ্গুলার হেডল্যাম্পセットアップ, যার ভেতরের অংশে চোখ ধাঁধানো এলইডি ডে-টাইম রানিং লাইটস বা ডিআরএল জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি গাড়ির পিছনের অংশে দুটি চমৎকার টেললাইটের মাঝখানে বসানো হয়েছে আধুনিক কানেক্টেড এলইডি সেটআপ এবং নতুন ১৫ ইঞ্চির ডায়মন্ড-কাট অ্যালয় হুইল গাড়িটির প্রিমিয়াম ভাবকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাহ্যিক রূপের পাশাপাশি গাড়িটির ভেতরের কেবিনেও আধুনিক প্রযুক্তি ও আরামদায়কতার এক দারুণ ছোঁয়া দিয়েছে টাটা মোটরসের প্রকৌশলীরা। বিনোদনের জন্য গাড়ির ড্যাশবোর্ডে যোগ করা হয়েছে একটি বিশাল ১০.২৫ ইঞ্চির ফ্রি-স্ট্যান্ডিং টাচস্ক্রিন ইনফোটেনমেন্ট সিস্টেম, যা সম্পূর্ণ তারবিহীনভাবে বা ওয়ারলেস অ্যাপল কারপ্লে এবং অ্যান্ড্রয়েড অটো সাপোর্ট করে। চালকের সুবিধার জন্য গাড়িটিতে ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইনের একটি টু-স্পোক স্টিয়ারিং হুইল এবং একটি নিখুঁত ডিজিটাল ইনস্ট্রুমেন্ট ক্লাস্টার। এর পাশাপাশি দীর্ঘ ভ্রমণে যাত্রীদের স্বস্তির কথা মাথায় রেখে এতে রাখা হয়েছে অটোমেটিক ক্লাইমেট কন্ট্রোল, রিয়ার এসি ভেন্ট, ওয়ারলেস ফোন চার্জিং পোর্ট এবং অটো-ফোল্ডিং ওআরভিএম-এর মতো সব প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির লাইফস্টাইল সুবিধা।
টাটা মোটরস সবসময়ই তাদের গাড়ির নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে থাকে এবং নতুন টিয়াগো ফেসলিফ্ট সংস্করণের ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। সাধারণ মধ্যবিত্তের এই গাড়িতে গলোবাল এনক্যাপ মানদণ্ড বজায় রেখে এবার সবকটি ভ্যারিয়েন্টেই স্ট্যান্ডার্ড বা বাধ্যতামূলক সুরক্ষা হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৬টি এয়ারব্যাগ। এছাড়াও এই সেগমেন্টে প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয়েছে একটি উন্নত ৩৬০ ডিগ্রি এইচডি সারাউন্ড ভিউ ক্যামেরা সিস্টেম, যা সংকীর্ণ রাস্তায় বা পার্কিংয়ের সময় চালককে চারপাশের নিখুঁত দৃশ্য দেখতে সাহায্য করবে। এর পাশাপাশি রাস্তায় গাড়ির ভারসাম্য বজায় রাখতে ইলেকট্রনিক স্ট্যাবিলিটি প্রোগ্রাম বা ইএসপি, ট্র্যাকশন কন্ট্রোল, ব্লাইন্ড ভিউ মনিটর, অ্যান্টি-লক ব্রেকিং সিস্টেম এবং ক্রুজ কন্ট্রোলের মতো উচ্চমানের সেফটি মেকানিজম যুক্ত করা হয়েছে।
গাড়িটির ডিজাইন এবং আধুনিক ফিচার্সে বিশাল এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হলেও এর মূল ইঞ্জিন মেকানিজমে কোনো ধরনের বদল বা রূপান্তর করা হয়নি। আগের মতোই এই গাড়িতে ভরসা রাখা হয়েছে টাটার নিজস্ব ১.২ লিটারের ৩-সিলিন্ডার রেভোট্রন শক্তিশালী পেট্রল ইঞ্জিনের ওপর, যা একটি ৫-স্পিড ম্যানুয়াল অথবা ৫-স্পিড এএমটি গিয়ারবক্সের সাথে যুক্ত থাকে। এই ইঞ্জিন থেকে সর্বোচ্চ ৮৫ বিএইচপি শক্তি এবং ১১৩ এনএম টর্ক উৎপন্ন হতে পারে, যা শহরের জ্যাম এবং হাইওয়েতে চলার জন্য অত্যন্ত নিখুঁত পারফরম্যান্স নিশ্চিত করে। তবে যারা আরও বেশি সাশ্রয়ী জ্বালানি চান, তাদের জন্য এই গাড়ির একটি আই-সিএনজি সংস্করণও বাজারে আনা হয়েছে এবং এর এএমটি বা অটোমেটিক ভ্যারিয়েন্টগুলোতে হাইওয়েতে স্মুথ ড্রাইভিংয়ের জন্য দেওয়া হয়েছে নতুন প্যাডেল শিফটার।
গাড়িটির সামগ্রিক ডাইমেনশন বা আকারের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি, ফলে আগের মতোই এতে চমৎকার ২৪০০ মিলিমিটারের হুইলবেস এবং ১৭০ মিলিমিটারের গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যাবে, যা দক্ষিণ এশিয়ার উঁচু-নিচু ও ভাঙা রাস্তার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পুরোনো প্রচলিত রঙগুলোর পাশাপাশি ক্রেতাদের মন জয় করতে এই গাড়িটিতে আরও তিনটি নতুন ও চমৎকার কালার অপশন যুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্যাংগং পালস, বারানসি ভাইব্রেন্স এবং সোবো সার্জ। অটোমোবাইল খাতের বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ৪.৬৯ লাখ রুপি বা সাশ্রয়ী বাজেটে এতগুলো প্রিমিয়াম ও আন্তর্জাতিক মানের সেফটি ফিচার থাকায় এই গাড়িটি মারুতি সুজুকি ওয়াগনআর এবং হুন্ডাই আই১০-এর মতো প্রতিষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দীদের বড় ধরনের বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও সাশ্রয়ী খরচের কারণে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি একটি চমৎকার ও যুগোপযোগী পারিবারিক বাহন হয়ে উঠবে।
