ইউক্রেনের ওডেসা অঞ্চলে বাণিজ্যিক বন্দরগুলোতে রাশিয়ার মিসাইল ও ড্রোন হামলা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে বৈশ্বিক নৌ যোগাযোগ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বেসামরিক বন্দরকর্মীদের প্রাণহানি ঘটছে বলে বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। মস্কো ইউক্রেনের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মাধ্যম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্ধ করার চেষ্টা তীব্রতর করায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
কৃষ্ণসাগরের উপকূলবর্তী এলাকাগুলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেবল জুলাই মাসেই বেসামরিক নৌযানের ওপর ৫৭টি রুশ হামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি হামলা হয়েছে গভীর সমুদ্রে এবং আরও ৬৭টি আঘাত হেনেছে সরাসরি বন্দরের বিভিন্ন অবকাঠামোতে।
মাঠপর্যায়ে কর্মরত শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত চরম বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। ওডেসার একটি প্রধান বন্দরে গুদামের শিফট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত স্ভেতলানা হালচেঙ্কো সম্প্রতি একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা থেকে বেঁচে ফিরেছেন, তবে সেই হামলায় তার সহকর্মীরা নিহত হন। তিনি বিবিসি নিউজকে জানান, তার ক্রেন অপারেটর তার থেকে মাত্র পাঁচ মিটার দূরে নিহত হয়েছেন এবং আরেকজন চালক কেবিনের ভেতরেই প্রাণ হারিয়েছেন। পায়ে ও পিঠে স্প্লিন্টারের আঘাত থাকা সত্ত্বেও হালচেঙ্কো কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যদিও তার একসময়ের ব্যস্ত কর্মস্থল এখন অনেকটাই নীরব।
অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের জীবনের ঝুঁকিও মারাত্মকভাবে বাড়ছে। ইউক্রেনের মেরিন ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওলেগ গ্রিগোরিউক বন্দর শ্রমিকদের ওপর মানসিক চাপের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, বন্দরে কর্মরত অনেক প্রবীণ কর্মী যারা এর আগে রণাঙ্গনে ছিলেন, তারা মনে করেন যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে এখন বন্দরে কাজ করা বেশি ভীতিকর। অধিকৃত ক্রাইমিয়া থেকে ছোড়া একটি মিসাইল মাত্র এক মিনিটের মধ্যে ওডেসায় আঘাত হানতে পারে। এর ফলে সুউচ্চ ক্রেন থেকে নেমে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার মতো কোনো সময়ই শ্রমিকরা পান না।
আন্তর্জাতিক নৌযানগুলোর ওপর এর আগেও হামলা হয়েছে, তবে বর্তমান সময়ের মতো এত ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হামলা আগে কখনো দেখা যায়নি। গত ১৯ জুলাই ইউক্রেনীয় ভুট্টাবাহী একটি তুর্কি মালিকানাধীন কার্গো জাহাজে তিনটি রুশ মিসাইল আঘাত হানে। এই ঘটনায় নয়জন ভারতীয় ও সিরীয় ক্রু এবং একজন ইউক্রেনীয় পাইলট নিহত হন। এক সপ্তাহ পর জাহাজটি ওডেসা উপকূলের কাছে ডুবে যায়। বৈশ্বিক শিপিং জার্নাল লয়েডস লিস্টের মতে, কৃষ্ণসাগর বর্তমানে জাহাজ চলাচলের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই হামলার প্রভাব মারাত্মক। শত শত মিটার জেটি এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা এবং বিশাল ক্রেনগুলো অলস পড়ে আছে। ওই এলাকার অন্যতম বৃহৎ একটি বন্দরের সহ-মালিক ও প্রধান নির্বাহী আন্দ্রে স্তাভনিৎসার বিবিসি নিউজকে জানান, মানুষ নিহত হওয়ার ঝুঁকির কারণে প্রায় কেউই এখন জাহাজ ভেড়াতে চাইছেন না, যার ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত থমকে গেছে। বারবার সাইরেন বাজার কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক বন্দর দিনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ ঘণ্টাই বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
এই হামলাগুলোকে বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া কৃষ্ণসাগর শস্য চুক্তির কারণে নিরাপদ সামুদ্রিক করিডোর তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়া সেই চুক্তি থেকে সরে আসার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। স্থানীয় বন্দর পরিচালকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার জাহাজের ওপর ইউক্রেনের সফল হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই মস্কো এখন নিয়ম করে ইউক্রেনের বন্দরগুলোতে আঘাত হানছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী নিজস্ব ড্রোন ব্যবহার করে ইতোমধ্যে প্রায় ২০০টি রুশ জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যা আজভ সাগর এবং অধিকৃত ক্রাইমিয়ার চারপাশে রাশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। এই সংকট কবে কাটবে, তা এখনো পুরোপুরি অস্পষ্ট।
